মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
“আমি বাঁচতে চাই, আমি সন্তানদের জন্য বাঁচতে চাই। আমাকে বাঁচান”—জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এমনই আকুতি ৩৪ বছর বয়সী সুমন মিয়ার। একদিকে দুই পায়ের শক্তি হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের কষ্ট। এর মাঝেও তার সবচেয়ে বড় ভাবনা নিজের জীবন নয়—মা-হারা ছোট্ট ছেলে হোসাইনকে নিয়ে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের দক্ষিণবাড়ি গ্রামের শফিক মিয়া ও রেহেনা বেগমের ছেলে সুমন মিয়া। সংসারে অভাব থাকলেও একসময় স্বপ্ন ছিল স্বাভাবিক জীবনযাপনের। ২০১৮ সালে মীম নামে এক নারীকে বিয়ে করেন তিনি। পরের বছর তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে হোসাইন। কিন্তু হোসাইনের বয়স যখন মাত্র আট মাস, তখন স্বামী-সন্তানকে রেখে চলে যান মীম। এরপর থেকেই বাবা-মায়ের সহায়তায় ছেলেকে নিয়ে সুমনের জীবন চলতে থাকে।
এরই মধ্যে ২০১৯ সালে ট্রাক্টর চালিয়ে কৃষিকাজ করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন সুমন। ওই দুর্ঘটনায় তার দুই পায়ের শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। মুহূর্তেই বদলে যায় তার জীবন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই ছোট একটি টং দোকান চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে শুরু করেন তিনি। ছেলেকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন এই অসহায় বাবা।
কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে সেই জীবনেও নেমে আসে আরও বড় বিপর্যয়। কিডনি রোগে আক্রান্ত হন সুমন। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। একদিকে চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে সংসারের খরচ—সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি।
ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সুমনের বাবা-মায়ের জমানো অর্থ ও সামর্থ্য প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অসহায় বাবা-মা চোখের সামনে সন্তানের কষ্ট দেখছেন, কিন্তু অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না।
তাদের কণ্ঠে এখন শুধু কান্না আর সাহায্যের আকুতি। সুমনের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তারা।
সুমনের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় এখন তার ছোট্ট ছেলে হোসাইন। বাবার অসুস্থতার মধ্যেও তাকে ছেড়ে যায়নি শিশুটি। দক্ষিণবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হোসাইন প্রতিদিন স্কুল শেষে ছুটে আসে বাবার কাছে।
বাড়ি ফিরে অসুস্থ বাবার পাশে বসে থাকে সে। বাবার প্রয়োজনীয় কাজ করে দেয়, যতটা সম্ভব দেখাশোনা করে। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা আর আনন্দে সময় কাটায়, সেই বয়সেই বাবার কষ্ট বুঝতে শিখেছে হোসাইন।
ছোট্ট হোসাইনের একটাই চাওয়া—তার বাবা যেন সুস্থ হয়ে আবার তার কাছে থাকেন। বাবাকে হারানোর ভয় যেন তার নিষ্পাপ চোখেমুখে স্পষ্ট।
আর সুমনেরও একটাই স্বপ্ন—ছেলের হাত ধরে আরও কয়েকটি বছর বেঁচে থাকা।
চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম পরিবার
সুমনের পরিবার জানায়, নিয়মিত ডায়ালাইসিসসহ চিকিৎসার পেছনে প্রতিনিয়ত বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য প্রায় নিঃশেষ। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় কিছুদিন চিকিৎসা চললেও এখন সেটিও আর সম্ভব হচ্ছে না।
রাজবাড়ী জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবু সাহেল মোহাম্মদ আলী আহসান বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরে চিকিৎসার জন্য আবেদন করা রোগীর তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম। ফলে প্রত্যেক রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তবে সুমনের মতো অসহায় রোগীদের পাশে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জীবনের কাছে বারবার হারতে হারতেও হাল ছাড়েননি সুমন। দুর্ঘটনায় দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছেন, স্ত্রীকে হারিয়েছেন, এখন কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। তবুও তার চোখে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
সেই স্বপ্নের নাম—হোসাইন।
বাবার পাশে বসে থাকা ছোট্ট ছেলেটিকে দেখিয়ে সুমনের আকুতি, “আমি শুধু আমার ছেলের জন্য বাঁচতে চাই।”
অর্থের অভাবে এই অসহায় বাবার চিকিৎসা যেন থেমে না যায়—এটাই এখন পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা। মানবিক মানুষদের সামান্য সহযোগিতাও হয়তো সুমনের জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারে নতুন আশার আলো, আর ছোট্ট হোসাইন ফিরে পেতে পারে তার বাবার নিরাপদ ছায়া।