জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান:
ইতিহাসের কোনো কোনো ব্যক্তিত্বকে শুধু তাঁদের নিজ সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিচার করা যায় না। তাঁদের চিন্তা, নেতৃত্ব ও কর্মপরিধি পরবর্তী বহু শতাব্দীর সমাজ ও সভ্যতার ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করে যে, তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে ইতিহাসের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. তেমনই এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপে তাঁর আবির্ভাব একটি ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা করেছিল, যা অল্প সময়ের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশাল এক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে।
মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপ ছিল কোনো একক রাষ্ট্রের অধীন নয়। বিভিন্ন গোত্র ও গোত্রজোট ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রধান কাঠামো। মক্কা ছিল কুরাইশদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র। কাবাকে কেন্দ্র করে আরবের বিভিন্ন গোত্রের ধর্মীয় যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল এবং মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্বও ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আরব সমাজে লিখিত রাষ্ট্রীয় আইন বা কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না, বরং গোত্রীয় রীতি, সম্মান, আনুগত্য এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ছিল সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এই সমাজকে ইসলামী উৎসে ‘জাহেলিয়াত’ বলা হয়েছে। ‘জাহেলিয়াত’ শব্দটি শুধু অশিক্ষা বোঝায় না, বরং এমন এক নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে আল্লাহর একত্ববাদ ও নবুয়তের নির্দেশনা থেকে বিচ্যুতি এবং গোত্রীয় অহংকার ও সামাজিক অনাচার প্রবল ছিল। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকার ও মূল্যবোধহীন সমাজ হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের দিক থেকে অতিসরলীকরণ হবে। সেখানে কবিতা, বাগ্মিতা, বাণিজ্য, আতিথেয়তা, সাহসিকতা, বংশপরম্পরার জ্ঞান এবং কিছু নৈতিক গুণের শক্তিশালী ঐতিহ্যও ছিল। ইসলামের আবির্ভাব সেই বিদ্যমান সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যেই একটি নতুন ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।
তবে সামাজিক বৈষম্য ছিল বাস্তব। গোত্রীয় পরিচয় মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখত। প্রতিশোধের সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি করত। দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থানও সর্বত্র সমান ছিল না। কুরআন বিশেষভাবে এতিম, দরিদ্র, নারী এবং কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথার উল্লেখ কুরআনে এসেছে; সূরা আত-তাকভীরে বলা হয়েছে, জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, ‘কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’
এই প্রেক্ষাপটেই মক্কার বনি হাশিম বংশে আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ সা. এর জন্ম। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন এবং শৈশবে তিনি মা আমিনাকেও হারান। এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শৈশবের একটি সময় তিনি মরু অঞ্চলের বেদুইন পরিবেশে অতিবাহিত করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষা, জীবনযাপন ও আরব সমাজ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে ইসলামী ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কৈশোর ও যৌবনে তিনি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর সততা ও আমানতদারির কারণে তিনি মক্কাবাসীর কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন। ইসলামী ঐতিহ্যে তাঁকে ‘আল-আমিন’ নামে অভিহিত করার কথা পাওয়া যায়। তাঁর বয়স যখন পঁচিশের কাছাকাছি, তখন তিনি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। খাদিজা রা. ছিলেন মক্কার একজন সম্মানিত ও সম্পদশালী ব্যবসায়ী নারী। তাঁদের দাম্পত্য জীবন নবীজির নবুয়তের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর জীবনে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় তিনি নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী ৬১০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই তিনি প্রথম ওহি লাভ করেন। ফেরেশতা জিবরাইল আ. তাঁর কাছে প্রথম যে আয়াত নিয়ে আসেন, তার সূচনা হয় ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’ শব্দ দিয়ে।
কুরআনের ভাষায়, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১)
এই ওহির মাধ্যমে তাঁর নবুয়তি দায়িত্বের সূচনা হয়। প্রথম পর্যায়ে তাঁর দাওয়াত ছিল তাওহিদ, আখিরাত, নৈতিকতা এবং মানুষের দায়িত্ববোধকে কেন্দ্র করে। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন এবং একই সঙ্গে সামাজিক অনাচার, অন্যায়, প্রতারণা, সুদ, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, মাপে কম দেওয়া ও দুর্বলদের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
মক্কার প্রভাবশালী নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিরোধের মূল কারণগুলোর একটি ছিল এই ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান। বহুদেববাদী ধর্মীয় কাঠামো, গোত্রীয় মর্যাদা এবং মক্কার প্রচলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর দাওয়াতের অনেক দিকের সংঘাত তৈরি হয়। প্রথম দিকে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অল্প। কিন্তু নির্যাতন ও সামাজিক চাপ সত্ত্বেও আন্দোলনটি ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে।
মক্কি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কিছু মুসলিমের আবিসিনিয়ায় হিজরত। নাজ্জাশির শাসনাধীন খ্রিস্টান আবিসিনিয়ায় তাঁরা আশ্রয় নেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। মুসলিমদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট আরোপ করা হয়। নবী সা. এর নিকটজনদের মধ্যেও একে একে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যু ঘটে। খাদিজা রা. ও আবু তালিবের মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর মদিনার ইয়াসরিব থেকে আগত কিছু মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। আকাবার অঙ্গীকারের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের জন্য নতুন সামাজিক ভিত্তি তৈরি হতে থাকে।
অবশেষে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয় হিজরত। মক্কা থেকে মদিনায় এই স্থানান্তর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। পরবর্তীকালে দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর সময় হিজরতকে ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে একটি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপিত হয়। মক্কার মুহাজির ও মদিনার আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মদিনায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য যে চুক্তির কথা ইসলামী ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে পাওয়া যায়, সেটি ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সম্পর্কের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এখানেই মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। মক্কায় তিনি ছিলেন মূলত ধর্মীয় ও নৈতিক সংস্কারের আহ্বানকারী, মদিনায় তিনি একই সঙ্গে একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র এবং বিচারব্যবস্থার প্রধান হয়ে ওঠেন। ফলে তাঁর মদিনার জীবন ইসলামের ধর্মীয় ইতিহাসের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মদিনা পর্বে মুসলিমদের সঙ্গে মক্কার কুরাইশদের সংঘর্ষ কয়েকটি বড় যুদ্ধে রূপ নেয়। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘটনা। এসব সংঘর্ষ শুধু সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মদিনার নতুন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব, মক্কার সঙ্গে সম্পর্ক এবং আরব উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য।
৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। প্রথম দৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য কিছু শর্ত কঠিন মনে হলেও পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই সন্ধি মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই আরবের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে মুসলিমদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক বিস্তৃত হয়।
এরপর ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ঘটে মক্কা বিজয়। দীর্ঘ সংঘাতের পর মুসলিমরা তুলনামূলকভাবে বড় শক্তি হিসেবে মক্কায় প্রবেশ করে। কাবাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত মূর্তিপূজার কাঠামো বিলুপ্ত করা হয় এবং কাবাকে এক আল্লাহর ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।