নিজস্ব প্রতিনিধি:
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্বাধীনতার পর এটিই সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হওয়ায় কর আদায় বৃদ্ধি, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সংস্থাটি।
এনবিআর সূত্র জানায়, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে রাজস্ব আহরণে গতি আনতে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করতে প্রশংসাপত্র প্রদান এবং নিয়মিত দিকনির্দেশনার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
রাজস্ব বোর্ডের নতুন পরিকল্পনায় উৎসে কর (টিডিএস) আদায়ের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি আরোপের পাশাপাশি কর ও ভ্যাট ফাঁকি শনাক্তে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, হিসাবপত্র, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ডিজিটাল তথ্য এবং প্রয়োজন হলে ইলেকট্রনিক ডেটা পরীক্ষা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনে বাধা সৃষ্টি হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বড় অঙ্কের জরিমানার বিধানও রয়েছে।
এনবিআরের দাবি, এই ক্ষমতার উদ্দেশ্য কোনো ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা নয়; বরং যারা উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছেন না বা তথ্য গোপন করছেন, তাদের চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে অভিযোগ গ্রহণের জন্য আলাদা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে নতুন এই পদক্ষেপ নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, কর প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন ছাড়া মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে হয়রানি ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। ব্যবসায়ী নেতারা প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চলতি অর্থবছরে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাত থেকে ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর। এ লক্ষ্য পূরণে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মাসিক বড় অঙ্কের লেনদেনকারী এবং ভ্যাট ফাঁকির ঝুঁকিতে থাকা প্রায় আট হাজার প্রতিষ্ঠানকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।
এ ছাড়া বছরে এক কোটি টাকার বেশি ভ্যাট প্রদানকারী প্রায় দুই হাজার বড় করদাতার কার্যক্রমও বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ভ্যাট ফাঁকি প্রতিরোধ করেই অতিরিক্ত প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, তামাক খাতে নজরদারি জোরদার, সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড সংযোজন, কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপন, হাজার হাজার করদাতার অডিট দ্রুত সম্পন্ন এবং বড় অঙ্কের কর বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রায় ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করলে এবং কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের অভিমত, রাজস্ব বৃদ্ধি করতে হলে শুধু অভিযান নয়, কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।