নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে এই পদ কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে—তা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে সাধারণত রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, স্বাভাবিক সময়ে সীমিত ক্ষমতার এই পদটি রাষ্ট্রীয় সংকট বা ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সংবিধান কী বলছে
১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর পর বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুযোগ রয়েছে। তবে অন্যান্য অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে সংসদ আহ্বান, স্থগিত বা ভেঙে দেওয়া, সংসদে পাস হওয়া বিলে সম্মতি, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তিচুক্তি অনুমোদন এবং ক্ষমা প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থাৎ স্বাভাবিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বেশ সীমিত। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ক্ষমতা ধরে রাখে।
তাহলে রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হলেও তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অবস্থান করেন। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকট দেখা দিলে এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থানই অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশও মনে করেন, রাষ্ট্রপতির পদটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দলীয় সরকারের প্রভাব থেকে এ পদ পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারেনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদের মতে, রাষ্ট্রপতি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলে দেশের অন্যতম নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে এ পদে বসানোর কারণে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ভূমিকার পরিসর অনেক সময় সংকুচিত হয়ে যায়।
সংকটে বদলে যেতে পারে সমীকরণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কয়েকটি ঘটনা রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রপতি ও সরকার বা অন্যান্য ক্ষমতাকেন্দ্রের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান এবং বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক স্পষ্ট হয়েছে।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের মধ্যে বিরোধের ঘটনা এর অন্যতম উদাহরণ। দুই জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর মধ্যেও পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, সাংবিধানিকভাবে সীমিত ক্ষমতার রাষ্ট্রপতিও বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেন।
৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাও আলোচনায়
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগের কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ওই সময়ে রাষ্ট্রপতির সামনে সংবিধান অনুযায়ী কিছু বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল।
তবে বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের অবস্থান এবং সামগ্রিক ভারসাম্যের কারণে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা সেইভাবে বিকশিত হয়নি বলে মত বিশ্লেষকদের।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, ওই সময় রাষ্ট্রপতির নেওয়া পদক্ষেপগুলো মূলত তৎকালীন বাস্তব ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার পাশাপাশি ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা, সাহস এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে ভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকা ভিন্ন হতে পারে।
এ কারণে রাষ্ট্রপতি পদকে কেবল আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্বাভাবিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করলেও কোনো বড় সাংবিধানিক সংকট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে তার অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সুরক্ষাও এ পদের বিশেষ মর্যাদা বাড়িয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে আদালতে সরাসরি জবাবদিহির সুযোগ সীমিত এবং তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ক্ষেত্রেও সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।
সর্বজনগ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতির প্রশ্ন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদকে প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ ও কার্যকর রাখতে হলে দলীয় আনুগত্যের বাইরে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন দলগুলো সাধারণত নিজেদের রাজনৈতিকভাবে আস্থাভাজন ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি পদে দেখতে চায়।
ফলে রাষ্ট্রপতি পদে কে বসবেন—এটি শুধু সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভারসাম্য, ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কাঠামো এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।
এ কারণেই বর্তমানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সংবিধান রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে সীমিত করলেও বাংলাদেশের ইতিহাস দেখিয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে এই পদটির গুরুত্ব কখনোই পুরোপুরি উপেক্ষা করার মতো নয়।