নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এর সদস্য হতে জোর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলির বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংস্কার কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আরসিইপিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পথ অনেকটাই এগিয়েছে। জোটের সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথাও জানিয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকেও সদস্যপদের পক্ষে সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসিইপির মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আরসিইপিতে যুক্ত হতে পারলে বাংলাদেশের জন্য বিশাল একটি আঞ্চলিক বাজার উন্মুক্ত হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখা এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে এ জোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর। ওই সময় জোটটির সদস্য হওয়ার আগ্রহ জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্মতিপত্র পাঠায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, চিলি ও হংকং আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে।
বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মিয়ানমার, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কাছে সদস্যপদের বিষয়ে সমর্থন চেয়েছে। এসব দেশের পক্ষ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে। নিউজিল্যান্ড সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও আলোচনায় একই ধরনের সমর্থন পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বৈঠকে আরসিইপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য গৃহীত সংস্কার কর্মসূচির বিষয়ও তুলে ধরছে। শিল্পের কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতিতে শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, মেধাস্বত্ব ও তথ্য সুরক্ষায় আধুনিক আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশ একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও দেশটির সমর্থন চেয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে। এ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
দুই দেশের সম্ভাব্য এফটিএ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এমন চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে আরও স্থিতিশীল প্রবেশাধিকার পেতে পারে। বিপরীতে নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ধাতব পণ্যের জন্য বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার আরও উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আরসিইপি চুক্তি ২০২০ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে কার্যকর হয়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও আসিয়ানের ১০ সদস্যসহ মোট ১৫টি দেশ এ জোটের অংশ। বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বিপুল জনসংখ্যার বাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্য জোটকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্য কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চুক্তির আওতায় আগামী দুই দশকে সদস্য দেশগুলো পর্যায়ক্রমে অধিকাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহারের দিকে যাবে। এর পাশাপাশি টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব ও পেশাদার সেবার মতো খাতও এর আওতায় রয়েছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘রুলস অব অরিজিন’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সরবরাহ ও উৎপাদন নেটওয়ার্ক আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদের ভাষ্য, আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। চীনসহ জোটের সব সদস্যের কাছ থেকেই সমর্থনের আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। সেপ্টেম্বরের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আবেদনটি পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
এদিকে নিউজিল্যান্ড আগামী ৭ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। ফলে আরসিইপিতে প্রবেশের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির পথও বাংলাদেশের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করছে।