আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
নেপালের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেসে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন করে তীব্র হয়েছে। দলের সাবেক সভাপতি ও পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবাকে আবার সভাপতি করে তার নেতৃত্বে ১৫তম সাধারণ সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ নেতারা। তবে দলটির আরেকটি অংশ এই উদ্যোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
দেউবার সমর্থকদের এই প্রস্তাব এসেছে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট ১৭ এপ্রিলের একটি রায় পুনর্বিবেচনার অনুমতি দেওয়ার পর। ওই রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাতের মতে, দল এখন দুটি পথের একটিতে এগোতে পারে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা, অন্যদিকে ১৪তম সাধারণ সম্মেলনে নির্বাচিত দেউবার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন সাধারণ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া। দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটাতে দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ সম্মেলন আয়োজনই কার্যকর পথ বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে অবস্থানের পর বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) নেপালে ফিরেছেন শের বাহাদুর দেউবা। কাঠমান্ডুতে পৌঁছে তিনি চুন্ডেভির একটি সমর্থক কার্যালয়ে যান। সেখানে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
দেশে ফেরার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেউবা দলীয় বিরোধ দ্রুত মেটানোর আহ্বান জানান। তার মতে, নেপালি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা জাতীয় ঐক্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন দেউবা। কিন্তু অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের একেবারে অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতার বিরোধিতা করেছেন তিনি।
দেউবাকে পুনরায় সভাপতি করার প্রস্তাব অবশ্য মেনে নেয়নি গগন থাপাপন্থী শিবির। দলের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ পৌডেল এ উদ্যোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।
পৌডেলের যুক্তি, বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে যে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আবার দলের সভাপতি করে সাধারণ সম্মেলন আয়োজন করা হলে সেটি আইন, দলীয় প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা—তিন দিক থেকেই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, দেউবা ইতোমধ্যে দুই মেয়াদে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তার উচিত দলীয় প্রতিযোগিতার বাইরে থেকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে নেপালি কংগ্রেসের ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ করা।
তবে দেউবা দেশে ফেরায় তাকে স্বাগত জানিয়েছেন গগন থাপা। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে থাপা বলেন, চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকা দেউবা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন—এতে তিনি সন্তুষ্ট।
নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব সংকটের পাশাপাশি দেউবার বিরুদ্ধে চলমান অর্থপাচার তদন্তও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। দেউবা বিদেশে থাকার সময় তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি আর্থিক বিষয়ে তদন্ত শুরু করে দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ।
দেউবা ও তার স্ত্রী এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে কাঠমান্ডু জেলা আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। তবে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট তাদের গ্রেফতার না করার নির্দেশ দেয় এবং পরোয়ানার আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলও দেউবা দম্পতির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে রাজি হয়নি। যদিও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তদন্ত এখনো চলছে।
জুলাইয়ে বিশেষ আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে দেশে ফেরার পর দেউবাকে ঘিরে নেপালি কংগ্রেসে নেতৃত্বের পুরোনো বিরোধ যেমন নতুন করে সামনে এসেছে, তেমনি তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি ও আর্থিক তদন্তও রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। দলটির পরবর্তী সাধারণ সম্মেলন কোন নেতৃত্বের অধীনে হবে, এখন সেটিই নেপালের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।