আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়া রোহিঙ্গাদের জীবন ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। দেশটিতে তাদের নাগরিক ও সামাজিক অধিকার সীমিত থাকার পাশাপাশি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গাবিরোধী বিদ্বেষমূলক প্রচারণা তাদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও কমিউনিটি সংগঠক নূর সাদেকের অভিজ্ঞতা সেই আশঙ্কারই প্রতিচ্ছবি। প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিয়মিত হুমকি পাচ্ছেন। এমনকি কোনো কোনো বার্তায় তার অবস্থানের জায়গার নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। এক ব্যক্তি তাকে গুলি ছোড়ার ভিডিওও পাঠিয়েছেন বলে জানান তিনি।
নূর সাদেক বলেন, নিরাপত্তার ভয়ে এখন তিনি খুব কমই বাইরে বের হন এবং বেশির ভাগ সময় ঘরেই থাকেন। সুযোগ পেলে মালয়েশিয়া ছেড়ে যেতে চান বলেও জানিয়েছেন তিনি।
নাগরিক অধিকার সীমিত, জীবিকাও অনিশ্চিত
মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
তবে দেশটিতে রোহিঙ্গাদের জন্য আনুষ্ঠানিক শরণার্থী শিবির নেই এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকারও নেই। তারা বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পান না। একইভাবে তাদের সন্তানদের মালয়েশিয়ার সরকারি স্কুলে পড়াশোনার সুযোগও সীমিত। ফলে আয়-রোজগার, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই তাদের বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে বিদ্বেষ
সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মালয়েশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রচারণা ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত মে মাসে ঈদুল আজহায় জবাই করা পশুর বর্জ্য রোহিঙ্গারা অনুপযুক্তভাবে ফেলেছে—এমন একটি অভিযোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরে জুনে রোহিঙ্গা ও মালয় দম্পতিদের ঘরে ২০ লাখের বেশি শিশু জন্ম নেওয়ার দাবি করা হয়। এই দাবির মাধ্যমে বিদেশিরা স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে—এমন পুরোনো আশঙ্কাকেও উসকে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি একটি ভুয়া ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। সেখানে একজনকে ‘রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দেখিয়ে দাবি করা হয়, তিনি একটি পুরো শহর রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছেন। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় দেশটির একজন উপপ্রধানমন্ত্রীর মেয়ের নামও আলোচনায় আসে।
সহানুভূতি থেকে বৈরিতায় পরিবর্তন
এক দশক আগেও মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সহানুভূতি দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পালিয়ে গেলে মালয়েশিয়ার অনেক মানুষ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
জাতিসংঘ সে সময় মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের ভয়াবহতা তুলে ধরে সেটিকে জাতিগত নিধনের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ নানা অসন্তোষের মধ্যে শরণার্থীরা স্থানীয় ক্ষোভের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অনলাইনের প্রচারণার প্রভাব পড়ছে বাস্তব জীবনেও
রোহিঙ্গাবিরোধী বক্তব্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। জুন ও জুলাইয়ে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাদানকারী অন্তত নয়টি অনানুষ্ঠানিক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের অভাবে বন্ধ হয়েছে। আবার কয়েকটি স্কুলের শিক্ষক ও কর্মীরা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।
এক শিক্ষক জানিয়েছেন, শিশুদের দলবদ্ধভাবে চলাফেরা না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য স্কুলে যাতায়াতও এখন নিরাপত্তার উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
নৌকা ফেরানো ও আটক বাড়ছে
রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশ ঠেকাতেও দেশটির কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকা ফিরিয়ে দেওয়া এবং তাদের আটক করার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের কার্যালয়ে যাওয়ার পর শতাধিক রোহিঙ্গাকে পুলিশ আটক করে। একটি উচ্ছেদের ঘটনার পর তারা জাতিসংঘের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে ২৯ জুলাই মালয়েশিয়া প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার কথা জানায়। তবে মিয়ানমারে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এই প্রত্যাবাসন নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
মালয়েশিয়ান বারের সভাপতি আনন্দ রাজ এ ধরনের প্রত্যাবাসনকে মানবিক ও বাস্তবসম্মত সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
সংকটের মধ্যেও মালয়েশিয়ামুখী রোহিঙ্গা
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ বাড়লেও দেশটিতে যাওয়ার চেষ্টা থেমে নেই। গত বছর প্রায় ৬ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা নৌপথে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৩০০ এবং ২০২০ সালে প্রায় ২ হাজার ৪০০।
মিয়ানমারে নিরাপত্তাহীনতা ও নিপীড়নই এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক রোহিঙ্গার কাছে সমুদ্রপথে বিপজ্জনক যাত্রাও নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।
এক রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভাষায়, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে না এলে হয়তো তাদের প্রাণই বাঁচত না।
ফলে একদিকে মিয়ানমারে নিরাপত্তার ভয়, অন্যদিকে আশ্রয় নেওয়া মালয়েশিয়ায় ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈরিতা—দুই সংকটের মাঝখানে আটকে পড়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। নিরাপদ ও স্থায়ী আশ্রয়ের পথ সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎও আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।