ইমরান মুক্তি পেলে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে যাবেন না: পিটিআই নেতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান কারাগার থেকে মুক্তি পেলে দেশটির সেনাবাহিনী বা সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াবেন না বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দলের মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি। তাঁর বক্তব্যকে ইমরান খান ও সামরিক নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের বিরোধ কমানোর সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বুধবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বুখারি বলেন, ইমরান খান হঠাৎ মুক্তি পেলেও দেশের ক্ষতি হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে অতীতের বিরোধ পেছনে ফেলে সমঝোতার পথেও যেতে পারে পিটিআই।

বুখারির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের স্বার্থে কখনো কখনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও কষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এর অর্থ হলো, কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধকে সরাসরি সামরিক নেতৃত্বের মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া নয়।

পিটিআই নেতার এমন মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইসলামাবাদের আদিয়ালা কারাগার থেকে ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে তাঁর দল।

সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ ইমরানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়। আদালত তাঁর চিকিৎসায় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করার কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিরতির পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।

৭৩ বছর বয়সী ইমরান খানের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেছেন, তিনি দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তবে পাকিস্তান সরকার তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে করা আগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইমরান খান ও পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের বিরোধ বহুদিনের। ২০২২ সালে সংসদে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রীর পদ হারানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়। ২০২৩ সালের আগস্টে দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস ও রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রিসহ আরও বহু মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। ইমরান এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।

২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ওই ঘটনার জন্য পিটিআই ও ইমরান খানকে দায়ী করে সেনাবাহিনী ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছিল।

তবে সে সময় ইমরান খান ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার ব্যাপারেও তিনি অনাগ্রহ দেখিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বিরুদ্ধেও প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ইমরানের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ফল হবে না; বরং তিনি দেশের ‘প্রকৃত কর্তৃপক্ষের’ সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। এই মন্তব্যকে অনেকে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আগ্রহ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী বুখারির সর্বশেষ বক্তব্য সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পিটিআই অতীতের সংঘাতের বদলে সমঝোতার পথ বেছে নিতে পারে।

তবে এখন পর্যন্ত ইমরান খান বা পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সমঝোতার কথা জানানো হয়নি। ফলে বুখারির বক্তব্যকে আপাতত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

এদিকে ইমরানকে হাসপাতালে নেওয়ার পর নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে। হাসপাতালের আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, ব্যারিকেড স্থাপন ও সাঁজোয়া যান দিয়ে টহল দেওয়া হচ্ছে। পিটিআইকে হাসপাতালের বাইরে সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন না করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

ইমরানের চিকিৎসা, তাঁর সম্ভাব্য মুক্তি এবং সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে পিটিআইয়ের সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। তাঁর দলের পক্ষ থেকে সমঝোতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত এলেও বাস্তবে সামরিক নেতৃত্ব ও ইমরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ কতটা কমে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top