রাশিয়ার সহায়তায় দাওয়েই অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলাকা খালি করতে মিয়ানমারে সেনা অভিযান

নিজস্ব প্রতিনিধি:

মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলে রাশিয়ার সহায়তায় দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) বাস্তবায়নের উদ্যোগ ঘিরে সামরিক অভিযান জোরদার হয়েছে। প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত এলাকা খালি করতে তানিনথারি অঞ্চলে শত শত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে স্থানীয় অধিকারকর্মী ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স। তাঁদের অভিযোগ, অভিযানের সময় কয়েকটি গ্রামে অগ্নিসংযোগ এবং বিস্তীর্ণ এলাকা অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।

আন্দামান সাগরের উপকূলে অবস্থিত দাওয়েই এসইজেডে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পকে মালাক্কা প্রণালির বিকল্প বাণিজ্যপথ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মিয়ানমারের সামরিক সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত—সাম্প্রতিক সেনা তৎপরতায় এমন ইঙ্গিতই মিলছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি দাওয়েইকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়িয়েছে মিয়ানমার। চলতি মাসে থাইল্যান্ড সফরের সময় জান্তা প্রধান থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং দাওয়েইকে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে তুলে ধরেন। পরে রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেও প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

থাইল্যান্ড সীমান্তসংলগ্ন তানিনথারি অঞ্চলে অবস্থিত দাওয়েই শহর। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, গত জুলাই থেকে সেখানে বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। একই সময়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত স্থানীয় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষও হয়েছে।

তানিনথারি রিজিয়ন পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের সদস্য সাও দাহ কো রয়টার্সকে বলেন, সামরিক বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে এসে বসতিগুলো খালি করার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, অভিযানের সময় কয়েকটি গ্রাম ও বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে।

ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের অধীন দাওয়েই ডিস্ট্রিক্টের একটি প্রতিরোধ ইউনিটের এক সদস্যও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, সেনারা অন্তত তিনটি গ্রামের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত মানুষদের সহায়তা করা তিনজন ত্রাণকর্মীকে সেনারা হত্যা করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রতিরোধযোদ্ধা বলেন, দাওয়েই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর উদ্দেশ্যেই এলাকাটি খালি করার অভিযান চালানো হচ্ছে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের সংগঠন ম্যাগা ইনিশিয়েটিভও তিন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনটির দাবি, গত ৯ জুলাই ইয়েবু টাউনশিপে সামরিক বাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের পর ওই তিনজনকে আটক করা হয় এবং পরে তাঁদের হত্যা করা হয়।

দাওয়েই প্রকল্পকে ঘিরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর এই তৎপরতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের গৃহযুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে নতুন করে বসতি উচ্ছেদের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

তবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রাম পোড়ানো, ত্রাণকর্মী হত্যাসহ স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে মিয়ানমার সরকার এবং দেশটিতে রাশিয়ার দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

দাওয়েই এসইজেড বাস্তবায়িত হলে আন্দামান সাগর হয়ে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়া ও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হতে পারে। তবে প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির প্রশ্নটি এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top