নিজস্ব প্রতিনিধি:
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের অভিযানের সময় পালিয়ে যাওয়া মুগ্ধ দাস একটি শ্মশানে আশ্রয় নিয়ে সেখানকার নিরাপত্তাকর্মী বিদ্যুৎ দাসের কাছে চারজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, শ্মশানের গার্ড বিদ্যুৎ দাসের সঙ্গে পুলিশ কথা বলেছে এবং তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট ভোরে মুগ্ধ দাসের বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। প্রায় তিন কিলোমিটার ধাওয়া করার পর মাহিগঞ্জ-দখীগঞ্জ শ্মশানে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তিনি। সেখানে বিদ্যুৎ দাসের কাছে পানি ও আশ্রয় চান এবং গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকে হত্যার কথা জানান বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পেছনে জমি নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা
পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পূর্বপুরুষের জমি বিক্রি, জমির অর্থের অংশীদারদের প্রাপ্য টাকা না পাওয়া এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ ছাড়া নিহত পরিবার ও অভিযুক্তদের সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য থেকেও কোনো ধরনের বিরূপতা তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। তবে এসব কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।
কীভাবে ঘটনার সূত্রপাত
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার আগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস মাদক সেবন করেন। পরে পাশের একটি বাড়ির ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে তারা অবস্থান নেন।
টিনের শব্দ বা অন্য কোনো কারণে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ছাদে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি। পরে ঘরের ভেতরে থাকা আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মও তাদের দেখে ফেলায় তাকে হত্যা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করার পাশাপাশি কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে খেজুরের বিচি, মাদক সেবনের সরঞ্জাম এবং আগুনে পোড়ানোর আলামতসহ বিভিন্ন উপকরণ জব্দ করার কথা জানিয়েছেন।
দুই অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির দাবি
পুলিশ জানায়, ২৩ আগস্ট সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাসকে আটক করা হয়। ওইদিন রাতে আদালতে ১৬৪ ধারায় তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সিদ্ধার্থের শরীরে আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং ঘটনার পর তিনি চিকিৎসা নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রথমে তাকে আটক করা হয়। পরে মুগ্ধকে ধরতে পুলিশ অভিযান চালায়।
তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিভিন্ন আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন দাবির ওপর নির্ভর না করে একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।