আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বতজুড়ে বিপর্যয় আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বুধবারের (২৬ আগস্ট) দুর্যোগের পর বৃহস্পতিবারও প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তথ্য থেকে জানা গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ৭০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেপাল পুলিশের হিসাবে, এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান এগোলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের একটি নদী অববাহিকায় পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে কাদা, পাথর, বরফ ও পানির প্রবল স্রোত তৈরি হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোত সীমান্তবর্তী জনপদ, সড়ক ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসাকে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের আশপাশের এলাকা।
দুর্যোগের কারণে বেশ কিছু শহর ও উপত্যকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশ হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাবার, তাঁবু ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপালে শত শত মানুষ নিখোঁজ
নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো ৮২৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।
বিদেশি নিখোঁজদের তালিকায় ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—১৭৭ জন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। মালয়েশিয়ার ৫৫ নাগরিকের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। সেখানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
তবে নেপাল ও তিব্বতের পৃথক নিখোঁজের তালিকায় একই ব্যক্তির নাম রয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
পাঁচ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মাঠে
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানান, বৃহস্পতিবার ২০ জন বিদেশিসহ অন্তত ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। ভারতও এসব ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা করছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট এলাকা পরিদর্শনে সড়কপথে সেখানে পৌঁছেছেন বলে তাঁর দপ্তর জানিয়েছে।
ভূমিকম্প নয়, বরফ-পাথরের ধসেই কম্পন?
দুর্যোগের কারণ নিয়েও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। শুরুতে স্থানীয় কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে।
সংস্থাটির মতে, যে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন প্রথমে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হয়েছিল, সেটি সম্ভবত বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকে উৎপন্ন ভূকম্পন শক্তি। অর্থাৎ পাহাড়ের ওপরের বিপুল ভর নিচে আছড়ে পড়ার পরই ধ্বংসাবশেষ ও পানির ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষ অবশ্য নতুন আরেকটি ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। গিরং এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসে সীমান্তের উজানে একটি অবরুদ্ধ হ্রদ তৈরি হয়েছে। সামনে বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সেটি ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তীর্থযাত্রীদের নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কা
নিখোঁজদের বড় একটি অংশ তিব্বতের কৈলাস-মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী সাগর পান্ডে জানিয়েছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার ১৫ নাগরিকের এখনো সন্ধান মেলেনি।
দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে তিনি জানান, হেলিকপ্টার থেকে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের সময় সেখানে বহু স্থাপনা ও বসতির কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। প্রবল স্রোতে হোটেল, রেস্তোরাঁ ও যানবাহনও ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্যোগ
নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একজন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ পাঠানোর পাশাপাশি নেপালকে ৫ লাখ ডলারের সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেছেন, দুর্গত এলাকা থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন, জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলো নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে ত্রাণসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জনবল পাঠাচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছে নেপাল ও তিব্বত। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন করে ভূমিধস বা বন্যার আশঙ্কা উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলছে।