নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা: হিমবাহের বিশাল অংশ ধসের প্রাথমিক ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবারের আকস্মিক ও প্রাণঘাতী বন্যার পেছনে হিমবাহের বড় একটি অংশ পাহাড় থেকে ধসে পড়ার ঘটনা ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্ভাব্য এ ঘটনাকে ‘আইস অ্যাভাল্যাঞ্চ’ বা বরফধস হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির ভূতত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল শুগার স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে জানান, ওই অঞ্চলের একটি হিমবাহের প্রায় দুই হাজার ফুট প্রশস্ত অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে বরফের বিশাল ভর এক কিলোমিটারের বেশি খাড়া পথ পেরিয়ে নিচের উপত্যকার দিকে ধসে পড়ে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধসের সময় বিপুল পরিমাণ বরফ ও পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। ঘটনাস্থলের চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, নিচের অংশের অবস্থা দেখে তা বিস্ফোরণের পরের দৃশ্যের মতো মনে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিত করে বলছেন না যে বরফধসই বন্যার একমাত্র কারণ। আকস্মিক বন্যার প্রকৃত উৎস নির্ধারণে আরও স্যাটেলাইট তথ্য, ভূকম্পন রেকর্ড ও আবহাওয়া-সংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

বরফ-পানির প্রবল স্রোত

স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ডান্ডির হিমবাহবিজ্ঞানী সাইমন কুকের মতে, পাহাড়ের উচ্চতায় থাকা বিশাল বরফখণ্ডে বিপুল শক্তি জমা থাকে। সেটি হঠাৎ ভেঙে নিচে নেমে এলে প্রচণ্ড আঘাতে বরফ চূর্ণ হয়ে পানি ও বরফের অত্যন্ত দ্রুতগতির স্রোত তৈরি করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের একটি প্রবাহ উপত্যকা ধরে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে ভোতেকোশি নদীর দিকে যেতে পারে। এর ফলে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি গ্রেনোবল আল্পসের ভূ-আকৃতিবিজ্ঞানী ক্রিস্টেন কুক জানান, স্থানীয় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ যন্ত্রে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৮টা ৪০ মিনিটে পাহাড়ের নিচের দিকে একটি বড় ভরের আকস্মিক গতিবিধির সংকেত পাওয়া যায়। এর কিছুক্ষণ পরই আরেকটি ‘ফ্লো সিগন্যাল’ শনাক্ত হয়, যা প্রবল পানিপ্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভূমিকম্প নাকি ধসের কম্পন?

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি কম্পন শনাক্ত করেছে। তবে এই কম্পনের সঙ্গে বরফ বা শিলাধসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাথমিক সংকেতটি সাধারণ ভূমিকম্পের মতো ছিল না। ভূকম্পন তথ্য, এলাকার ভূপ্রকৃতি এবং স্যাটেলাইট চিত্র একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে তাদের ধারণা—শিলা ও বরফের একটি বড় অংশ একযোগে নিচে নেমে গিয়ে ভয়াবহ প্রবাহ সৃষ্টি করতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রশ্ন

ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উষ্ণ তাপমাত্রাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন গবেষকরা। শুগারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্যোগের আগের দিন ওই এলাকায় বরফের আচ্ছাদন দ্রুত কমে যায়। এর পেছনে তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া কাজ করে থাকতে পারে।

তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহের বরফ গলে কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে বড় বরফখণ্ড বিচ্ছিন্ন হয়ে ধস নামার ঝুঁকি বাড়ে। তবে এই ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া ও হিমবাহের তথ্য প্রয়োজন।

২০২১ সালের ভারতের দুর্যোগের সঙ্গে মিল

সাইমন কুক এ ঘটনাকে ভারতের উত্তরাখণ্ডে ২০২১ সালে ঘটে যাওয়া হিমবাহজনিত আকস্মিক বন্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওই দুর্যোগেও পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহের অংশ ধসে প্রবল পানির স্রোত তৈরি হয়েছিল এবং শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এবারের ঘটনায়ও বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, দৃশ্যমান পানির পরিমাণ সাম্প্রতিক কয়েকটি হিমবাহজনিত দুর্যোগের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে।

প্রকৃত কারণ জানতে আরও তথ্য প্রয়োজন

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় এলাকার সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্র পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বন্যার আগে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটি এখনো সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়।

ড্যানিয়েল শুগার মনে করছেন, শুধু বরফধস দিয়ে পানির এত বড় প্রবাহের পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া নাও যেতে পারে। এর সঙ্গে অন্য কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যুক্ত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সুতরাং নেপালের এই আকস্মিক বন্যার পেছনে হিমবাহধস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—এমন শক্তিশালী প্রাথমিক ইঙ্গিত মিললেও, দুর্যোগটির পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক কারণ নির্ধারণে আরও কয়েক দিনের গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের অপেক্ষা করতে হবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top