নিজস্ব প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে রোপা আমন মৌসুমে প্রয়োজনের সময়ে সার না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। উপজেলায় সরকারি বরাদ্দ পর্যাপ্ত থাকার পরও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরবরাহ ও বিতরণে জটিলতার অভিযোগ উঠেছে। ফলে অনেক কৃষক নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর খোলা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত না খোলা, ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত চাহিদার সামঞ্জস্য না থাকা এবং গুদাম ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। কোথাও সার আসার খবর পেলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক কৃষক জড়ো হওয়ায় দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে।
চলতি আমন মৌসুমে ভূরুঙ্গামারীতে প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। কৃষকদের জন্য উপজেলায় বিসিআইসির ১০ জন এবং বিএডিসির সাতজন ডিলার রয়েছেন। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ১২৪ দশমিক ৪৫ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শিলখুড়ি ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১১৯ দশমিক ৯ টন।
তবে কৃষকদের দাবি, বরাদ্দের পরিমাণ কাগজে থাকলেও প্রয়োজনের সময় ইউনিয়নের বিক্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সার পাওয়া যাচ্ছে না। ধান রোপণের পর নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারায় উৎপাদন ও ফলন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পাগলার হাট এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি ১২ বিঘা জমিতে আমন আবাদ করেছেন। ধান রোপণের ২১ দিনের মধ্যে সার দেওয়ার প্রয়োজন হলেও ২৬ দিনেও তিনি সার পাননি। শেষ পর্যন্ত বেশি দাম দিয়ে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হয়েছে তাকে।
স্থানীয় কৃষকদের আরও অভিযোগ, কিছু ডিলারের মূল গুদাম সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাইরে থাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ের বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত সার সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। পাশাপাশি বিসিআইসি ডিলারের কাছ থেকে বিএডিসি ডিলারকে সার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গুদামের বেড়া ভেঙে সার নেওয়ার ঘটনা
সারের সংকট ঘিরে গত ২৩ আগস্ট শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে সার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২৪ আগস্ট বিকেল পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত পরিস্থিতি এবং কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
মোট ঘাটতি নেই, বলছে কৃষি বিভাগ
কৃষি বিভাগের দাবি, পুরো উপজেলায় সারের সামগ্রিক ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দের ভারসাম্যহীনতার কারণে। শিলখুড়ি ইউনিয়নের চাহিদার তুলনায় সেখানে সরবরাহ কম হওয়ায় সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, আগে ডিলারদের প্রায় সমপরিমাণ সার দেওয়ার কারণে শিলখুড়ি ইউনিয়নে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পৌঁছাত না। এখন অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে সার সমন্বয় করে সেখানে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, কৃষকদের দাবি, শুধু বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত খোলা, বরাদ্দ অনুযায়ী সময়মতো সার পৌঁছানো এবং স্বচ্ছভাবে কৃষকদের মধ্যে তা বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি মো. আবদুল আজিম জানান, সার লুটের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ডিলার ২৩ আগস্ট রাতে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পরদিন বিকেল পর্যন্ত ১১৫ বস্তা সার উদ্ধার হয়েছে এবং অবশিষ্ট সার উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ বলেন, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ করছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কোনো অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।