নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নতুন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব তিনি এখনো বহন করছেন কি না, নাকি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে তা ত্যাগ করেছেন—এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তার মন্ত্রিসভায় যোগদানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হয়। এতে চারজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী নতুন করে শপথ নেন। তাদের একজন হুমায়ুন কবির। এর আগে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রশ্ন উঠতেই সরাসরি উত্তর মেলেনি
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি গণমাধ্যমে হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চান।
তবে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে হুমায়ুন কবির পাল্টা জানতে চান, বিষয়টি নিয়ে কে সংবাদ প্রকাশ করেছে। তার এই প্রতিক্রিয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, শৈশব থেকেই যুক্তরাজ্যে বসবাসের কারণে হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে তিনি সেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সংবিধানে কী বলা আছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বা আনুগত্য থাকলে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক অযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, বিষয়টি সরাসরি সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমপি, মন্ত্রী বা সাংবিধানিক পদে যেতে পারবেন কি না, সেটি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অন্যদিকে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংবিধানিক শর্ত প্রযোজ্য হয়। ফলে কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হলে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব এক নয়
হুমায়ুন কবির গত ছয় মাস প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তিনি কীভাবে ওই দায়িত্ব পালন করেছেন—এ প্রশ্নও উঠেছে।
তবে আইনগত কাঠামোর দিক থেকে উপদেষ্টা ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান এক নয়। উপদেষ্টা পদ সাংবিধানিকভাবে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য নয়; এটি মূলত প্রশাসনিক ও পরামর্শমূলক দায়িত্ব। ফলে উপদেষ্টা হওয়ার ক্ষেত্রে যে শর্ত প্রযোজ্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সময় একই শর্ত প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
এই পার্থক্যের কারণেই দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কোনো ব্যক্তির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনে যে ধরনের বাধা নাও থাকতে পারে, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে তা সাংবিধানিক প্রশ্নে পরিণত হতে পারে।
শামা ওবায়েদের ক্ষেত্রেও ছিল নাগরিকত্বের প্রসঙ্গ
সরকারের আরেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়েও তুলনা সামনে এসেছে।
তবে হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা সরকারি ঘোষণা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা অব্যাহত
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নির্ভর করছে তিনি বর্তমানে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিক কি না এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথের আগে প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না—তার ওপর।
এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্বের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।