নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি দেশের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত এ ব্যবস্থার আওতায় অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত মার্কিন ফেডারেল রেজিস্টারের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নতুন এই শুল্ক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় সব ধরনের পণ্যের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কয়েকটি শিল্পখাতকে এর বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে সমতা নিশ্চিত করাই এ সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে আসছে। এখন অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদেরও একই ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করার সময় এসেছে। তার মতে, নতুন শুল্ক মানবাধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখবে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট শুল্কহার ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। চীনসহ আরও কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর চালু হওয়া অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে পরিবহনে থাকা পণ্যগুলো সাময়িকভাবে এই নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন নীতি মূলত বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এটি শুধু আগের শুল্কের বিকল্প নয়; বরং জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানেরই প্রতিফলন।
নতুন শুল্ক থেকে তেল ও গ্যাস, সার, নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্য, গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, তামা এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পণ্য অব্যাহতি পাবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা (ইউএসএমসিএ) বাণিজ্য চুক্তির আওতাভুক্ত পণ্যও এই শুল্কের বাইরে থাকবে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশে জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে কার্যকর আইন রয়েছে, সেসব দেশের জন্য তুলনামূলক কম শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক আইনগত সংস্কারের কারণে ভারতসহ কয়েকটি দেশ ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় এসেছে।
এদিকে গণশুনানির পর আরও কয়েকটি পণ্য—যেমন নির্দিষ্ট চিনিজাত দ্রব্য, পিগ আয়রন, পশু ও বীজজাত পণ্য এবং কিছু রাসায়নিক উপাদান—নতুন শুল্ক থেকে অব্যাহতির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন শুল্ক কাঠামো বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ও বাজার কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে।