রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্ত এলাকায় পাথরবোঝাই ভারতীয় ট্রাকের চালককে কৌশলে অপহরণ, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তাক্ত ও অর্থ ছিনতাইয়ের আলোচিত মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রায়ে সাজাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অপহরণের দায়ে দণ্ডবিধির ৩৬৫ ধারায় আসামিদের পৃথকভাবে আরও সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুটি দণ্ডই একই সঙ্গে কার্যকর হবে বলে রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন বিচারক।
সোমবার (২৭জুলাই) দুপুরে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ এর বিজ্ঞ বিচারক এস. এম. শফিকুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই পাটগ্রাম উপজেলার বাসিন্দা। তারা হলেন:- (১) মো. সবুজ মিয়া উফারমারা সোনারভিটা, পিতা মো.শফিকুল ইসলাম (২) মো,রমজান আলী পিতা, মোহাম্মদ আলী হাজীদাসপাড়া। ও মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে তানজিদ ভাটিয়াটারী এলাকার মো. শামছুল হক ওরফে সামছুর রহমানের ছেলে বলে জানাগেছে।
রায় ঘোষণার সময় একমাত্র আসামি আরিফুল ইসলাম তানজিদ কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। অপর দুই আসামি সবুজ ও রমজান বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সাহায্যের নামে অপহরণ ও নির্মম হামলার স্বীকার ও মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সূচনা ২০১৯ সালের ২১ আগস্ট দুপুরে। বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথরবোঝাই ট্রাক নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন চালক লক্ষ্মীনন্দর সিং। ওই দিন গভীর রাতে বুড়িমারী প্রধান সড়কে তার ট্রাকটি যান্ত্রিক ত্রুটি ও রাস্তায় আটকে যায়।
রাত আনুমানিক ১টার দিকে স্থানীয় তিন যুবক ভিকটিম চালকের অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। তারা একটি ক্রেন এনে ট্রাকটি উদ্ধার করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে কৌশলে লক্ষ্মীনন্দরকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে নেয়। এরপর সাহায্য করার বদলে তারা ট্রাকচালককে নিয়ে যায় এক নির্জন স্থানে।
পরে রাত ৩টার দিকে পাটগ্রামের শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর ভোটবাড়ী এলাকার একটি ফাঁকা জায়গায় নিয়ে আসামিরা চালকের ওপর চড়াও হয়। সেখানে তাকে ধারালো চাকু দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। জীবন বাঁচাতে চালক আকুতি জানালেও আসামিরা তার কাছে থাকা ৮ হাজার ভারতীয় রুপি ছিনিয়ে নিয়ে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে সটকে পড়ে।
ঔ রাতে ঘটনার পর রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় চালক লক্ষ্মীনন্দর সিংকে দেখতে পান টহল পুলিশের একটি দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলে ভিকটিম ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় আইনি জটিলতা এড়াতে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের গ্রাম পুলিশ মো. মতিয়ার রহমান বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত শেষে পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক বিশ্লেষণ শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক এই রায় দেন।
আদালতের এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। মামলা পরিচালনা শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট সামসুল আলম মিলন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “একজন প্রতিবেশী দেশের নাগরিককে এভাবে অপহরণ করে জখম ও লুটপাট চালানো অত্যন্ত জঘন্য এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকিস্বরূপ।
দীর্ঘ ও চুলচেরা বিচারিক বিশ্লেষণ শেষে বিজ্ঞ আদালত যে দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন, তাতে আমরা পূর্ণ সন্তুষ্ট। এই রায়ের ফলে সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে এবং অপরাধীরা কঠোর বার্তা পাবে বলে জানা তিনি।