খাদ্যে মিলছে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু, নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সর্বশেষ পরীক্ষার ফলাফল। সংস্থাটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরীক্ষায় পানীয় পানি, শাকসবজি, তেল, দুধ, মসলা, মিষ্টি, শিশুখাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু এবং রোগজীবাণুর উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত ও ভেজাল খাদ্য দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, হৃদরোগ, স্নায়বিক সমস্যা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পানীয় পানিতেও দূষণের প্রমাণ

পরীক্ষার প্রতিবেদনে কয়েকটি জেলার পানির নমুনায় ফিকাল কলিফর্ম জীবাণু শনাক্ত হয়েছে, যা সাধারণত মলদূষণের নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

শাকসবজিতে ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর জীবাণু

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার শাকসবজির নমুনায় স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি সিসা ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কিছু নমুনায় ই-কোলাই, সালমোনেলা ও ফিকাল কলিফর্ম জীবাণুও শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সিসা ও ক্যাডমিয়াম মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে জমে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশেও এসব উপাদান মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

গুড়, মুড়ি ও মিষ্টিজাত পণ্যে নিষিদ্ধ উপাদান

বিভিন্ন জেলার গুড়ের নমুনায় খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট পাওয়া গেছে। একইভাবে কয়েকটি জেলার মুড়িতে ইউরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা খাদ্যমানের জন্য উদ্বেগজনক।

এ ছাড়া জিলাপি ও আচারের নমুনাতেও নিষিদ্ধ বা অতিরিক্ত সংরক্ষণকারী রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

তেল, মধু ও দুগ্ধজাত পণ্যে অনিয়ম

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু সরিষার তেলে অতিরিক্ত অ্যাসিড এবং সয়াবিন তেলের কয়েকটি নমুনায় ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি ও অনুমোদিত মাত্রার বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, মধুর নমুনায় অতিরিক্ত চিনি জাতীয় উপাদান এবং কিছু ঘি ও দুধজাত পণ্যে মান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় উপাদানের ঘাটতি ধরা পড়েছে। একটি মিল্ক পাউডারের নমুনায় সিসাও শনাক্ত হয়েছে।

বিস্কুট, চানাচুর ও মসলাতেও ভেজালের ইঙ্গিত

কয়েকটি বিস্কুটে নিষিদ্ধ রাসায়নিক, চানাচুরে অতিরিক্ত লবণ এবং কিছু নমুনায় অ্যাফ্লাটক্সিন পাওয়া গেছে। এছাড়া হলুদ ও মরিচের গুঁড়ায় নিম্নমানের উপাদান মেশানোর প্রমাণও মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন এসব খাদ্য গ্রহণ করলে হজমের সমস্যা থেকে শুরু করে ক্যানসার, লিভার ও কিডনির জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।

নজরদারি জোরদারের আশ্বাস

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নিয়মিত খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিএসটিআই ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথ অভিযান এবং আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদান নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কঠোর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত বাজার তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top