সয়াবিন তেলে ফের মূল্যবৃদ্ধির চাপ, কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে ভোজ্যতেলের বাজারে ফের অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকা সত্ত্বেও সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে সরকারকে দাম বাড়াতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মিল পর্যায় থেকে সরবরাহ কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে ইতোমধ্যে ডিলারদেরও সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় খুচরা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি প্রায় ১৯৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ১৮ টাকা বেশি।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, দেশের ভোজ্যতেল বাজারের বড় অংশ কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। তার অভিযোগ, এসব কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে চাপ সৃষ্টি করে এবং পরে মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরেই একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকার পরও বাজারে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কারসাজি বন্ধে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ীদের

বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রস্তাবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ১ হাজার ১৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৮৮ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি খোলা পাম তেলের দাম ১৩ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য আমদানি খরচ বেড়েছে। ফলে বর্তমান দামে তেল বাজারজাত করলে তাদের লোকসান হচ্ছে।

সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টন প্রায় ১ হাজার ১৯১ ডলার। এক মাস আগে তা ছিল ১ হাজার ১৬৯ ডলার। একইভাবে অপরিশোধিত পাম তেলের দামও বেড়ে প্রতি টন প্রায় ১ হাজার ১৬২ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সরবরাহ কমানোর আশঙ্কা

কাওরান বাজারের এক ডিলারের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির অনুমোদন না পেলে ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তার দাবি, কোম্পানি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল না এলে ডিলারদের পক্ষেও খুচরা বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর বাজারে সরবরাহ কমে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো দোকানদার যেখানে দিনে ২০ কার্টন পর্যন্ত তেলের চাহিদা জানিয়েছিলেন, সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছিল মাত্র দুই থেকে চার কার্টনে।

সরবরাহ সংকটের সুযোগে সে সময় খোলা সয়াবিন তেলের দাম সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। পরে বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৯ এপ্রিল সরকার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি চার টাকা করে বাড়ানোর অনুমোদন দেয়।

সরকারের সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবিত মূল্য এবং বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে দেওয়া বিভিন্ন কর-সুবিধার বিষয়টিও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে হিসাব করতে হবে।

এ বিষয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠক ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সেখানে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই যদি সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে সাধারণ ভোক্তাকে বাড়তি দামে সয়াবিন তেল কিনতে হতে পারে।

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব যাচাইয়ের পাশাপাশি দেশের বাজারে আমদানি, মজুত, মিল থেকে সরবরাহ এবং খুচরা বিক্রির প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় সরবরাহ সংকটকে অজুহাত বানিয়ে ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top