নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের দেওয়া বক্তব্য ও অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো শিক্ষক অপরাধে জড়িত থাকলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
শনিবার (৮ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান-২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন উপাচার্য। ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এ সভার আয়োজন করা হয়।
অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে এ ধরনের অবস্থানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিহিংসার পথ অনুসরণ না করে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উপাচার্যের ভাষ্য, কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার করা উচিত নয়, আবার অপরাধ করলে শাস্তি থেকেও কেউ যেন মুক্তি না পান।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবির প্রসঙ্গে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, কেন একজন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহসহ কোনো অপরাধের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার হওয়া উচিত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। তখন শিক্ষকরা তাদের নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
তিনি বলেন, আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকলে দেশের মানুষের মধ্যে একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা আরও জোরালো হয়। সেই সময় শিক্ষকরাও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষকদের ওপর নজরদারি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তার দাবি, শিক্ষকদের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হতো এবং ভিন্নমতের কারণে অনেকে নানা ধরনের চাপ ও হয়রানির মুখে পড়েছিলেন।
অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের একটি অংশ তখনও প্রতিবাদ করেছে, রাজপথের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এসব ভূমিকা ভুলে গেলে আন্দোলনে নিহত ও দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি অবিচার করা হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দুটি সময়ের ঘটনা ও প্রেক্ষাপট এক নয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই দেশের মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। তাই ১৯৭১ ও ২০২৪—দুই সময়ের ঘটনাকেই যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে স্মরণ করতে হবে।
বর্তমান সরকারকে কাজ করার জন্য সময় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে উপাচার্য বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের জমে থাকা সমস্যা মাত্র কয়েক মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও সংকট দূর করতে সময়ের প্রয়োজন।
তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে বৈষম্য, দমন-পীড়ন কিংবা স্বৈরাচারী প্রবণতার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে হলে ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।