নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশজুড়ে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যখন বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং বাড়ছে, তখন ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন। যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে গত এক বছরে কেন্দ্রটির দুই ইউনিটের কোনো না কোনোটি প্রায় ৩০ বার বন্ধ হয়েছে।
বাগেরহাটের এই বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত। এর অর্থায়নে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটি চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই ঘনঘন উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত এক বছরে কয়লার ঘাটতির কারণে তিনবার এবং বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিক সমস্যায় ২৭ বার কেন্দ্রটির কোনো একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছে। কখনো বয়লার, কখনো জেনারেটর, আবার কখনো ড্রেইন লাইনের সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
একের পর এক বন্ধ ও পুনরায় চালু
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত রামপালের দুই ইউনিটে একাধিকবার উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে কয়লা সংকটে দ্বিতীয় ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তা চালু করা হয়। এরপর প্রথম ইউনিটও কয়েক দফা বন্ধ ও চালুর মধ্যে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ইউনিটে ড্রেইন লাইন লিকেজসহ বিভিন্ন যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয়। ডিসেম্বরেও প্রথম ইউনিট কয়েক দফা বন্ধ হয়। চলতি বছরের শুরুতেও একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে।
জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বয়লার, জেনারেটর ও অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুই ইউনিটের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে বয়লার-সংক্রান্ত সমস্যার পুনরাবৃত্তি কেন্দ্রটির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ফলে কেন্দ্রটির ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট একসঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখার বিষয়টি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
লোডশেডিংয়ের সময়ই উৎপাদনে ধাক্কা
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তীব্র গরমে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সংকটের সময়ে জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ অবস্থায় রামপালের মতো বড় কেন্দ্র থেকে নিয়মিত উৎপাদন না পাওয়া বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
কেন্দ্রটির সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখতে গত জুনে সেখানে পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি কেন্দ্রটির ঘনঘন বন্ধ হওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে।
এরপর বিদ্যুৎ বিভাগের এক বৈঠকে কেন্দ্রটির উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ। কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে বারবার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চান তিনি। এভাবে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র চলতে থাকলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রামপালের দাবি, উৎপাদন বেড়েছে
তবে কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে রামপাল রেকর্ড ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট।
অর্থাৎ কেন্দ্রটির দাবি অনুযায়ী, এক বছরে মোট উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে ঘনঘন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা কেন্দ্রটির পরিচালন সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি করেছে, তা থেকেই যাচ্ছে।
প্রতি ইউনিটে ব্যয় বেশি, রয়েছে ভর্তুকিও
রামপালে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে নেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পরে জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তা সরবরাহ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় ১৪ টাকার বেশি। বিপরীতে সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে প্রায় ১১ টাকায়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য ভর্তুকির মাধ্যমে সমন্বয় করতে হয়।
এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, নির্দিষ্ট কাঠামোর অধীনে প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বিষয়টিও রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে কেন্দ্রটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ভারতীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়েও আলোচনা
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ মালিকানাধীন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মালিকানা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)-এর মধ্যে সমানভাবে বিভক্ত।
বর্তমানে কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা, প্ল্যান্টপ্রধানসহ একাধিক ভারতীয় কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রটির কয়েকজন ভারতীয় কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ভারত চলে যাওয়ার ঘটনায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়েছিল। পরে তাদের আর কাজে ফেরানো হয়নি এবং ভারতের এনটিপিসির পক্ষ থেকে নতুন কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়।
বড় বিনিয়োগের পরও স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন
বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়লেও ঘনঘন যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটের কারণে ইউনিট বন্ধ হওয়ার ধারাবাহিকতা বিদ্যুৎ খাতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে যখন বিদ্যুতের চাহিদা তীব্র এবং লোডশেডিং কমাতে অতিরিক্ত উৎপাদনের প্রয়োজন, তখন বড় একটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি।
রামপালের উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বারবার দেখা দেওয়া যান্ত্রিক ত্রুটির স্থায়ী সমাধান, কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রটির পরিচালন ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়টি এখন বিদ্যুৎ বিভাগের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।