নিজস্ব প্রতিবেদক:
ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সংসদ সচিবালয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিগগির নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি জানিয়ে চিঠি দেয়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই সংসদ সচিবালয় থেকে ইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হবে।
এরপর নির্বাচন কমিশন যদি সাতক্ষীরা-৪ আসনটি শূন্য ঘোষণা করে, তাহলে সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে বিষয়টি সদস্যদের অবহিত করবেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এখন সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্ব হলো বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো। ইসি পরবর্তী সিদ্ধান্ত সংসদ সচিবালয়কে জানালে অধিবেশনে তা উপস্থাপন করা হবে।
এর আগে ২৩ জুলাই গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ওই চিঠি দেন।
ভিডিও ছড়ানোর পর বহিষ্কার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত করে এবং নৈতিক স্খলনের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ২২ জুলাই জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে ভিডিও প্রকাশের পর প্রথম দিকে জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে তৈরি হতে পারে বলে দাবি করেছিলেন। পরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
তিনি দাবি করেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে মরিয়মকে বিয়ে করেছেন।
এমপি পদ নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন
দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আইনগত প্রশ্ন তৈরি হয়।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সদস্যপদ বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে পদত্যাগ করেননি এবং সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোটও দেননি।
অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে দুই বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড হলে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারানোর বিধান রয়েছে। তবে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এমন কোনো আদালতের রায় বা কারাদণ্ড হয়নি।
ফলে তার ক্ষেত্রে সংবিধানের ওই বিধান সরাসরি প্রযোজ্য কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন। এ কারণেই সংসদ সচিবালয় বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনবারের সংসদ সদস্য
৭৪ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে এবার তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে ১৯৯১ সালে একই আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন তিনি।
রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীতে সক্রিয় গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখন তার দলীয় বহিষ্কার সংসদ সদস্য পদে কী প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর।