রাজশাহীতে সারের বাজারে সিন্ডিকেটের দাপট, বাড়তি দামে বিপাকে কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী অঞ্চলে আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ ও বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগও তীব্র হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামে সার না পেয়ে তাদের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকশ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। ডিলার, অবৈধ খুচরা বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট তদারকি ব্যবস্থার একটি অংশকে ঘিরে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন তারা।

কৃষকদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা গুদাম থেকে সার তোলার পর নির্ধারিত দোকানে নেওয়ার আগেই তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক জেলা বা উপজেলার জন্য বরাদ্দ করা সার অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজশাহীর তানোর, মোহনপুর ও গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন চাষের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কৃষকরা। জমি তৈরির পাশাপাশি কোথাও কোথাও আগাম জাতের আমন রোপণও শুরু হয়েছে। আগস্টের শেষ দিক পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলার কথা। ফলে বিভিন্ন ধরনের সারের চাহিদা এখন বেশি।

তানোরের রিশিকুল ইউনিয়নের ছোট পলাশী গ্রামের কৃষক সাজেদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলারের দোকানে গেলে অনেক সময় ‘সার নেই’ বলা হচ্ছে। পরে বাধ্য হয়ে বেশি দামের খুচরা দোকান থেকে সার কিনতে হচ্ছে।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির তথ্য অনুযায়ী, কৃষকদের জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা। একই পরিমাণ ডিএপি ও এমওপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। তানোরের পলাশী এলাকার কৃষকদের দাবি, টিএসপির ৫০ কেজির বস্তা কিনতে তাদের ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ডিএপির ক্ষেত্রে দাম উঠেছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। আর নির্ধারিত ১ হাজার ৫০ টাকার এমওপি সারেও বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেন বলেন, ডিলারের কাছে সার চাইলে মজুত শেষ বলে জানানো হয়। অথচ খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গেলে চাহিদামতো সার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, এভাবে নির্ধারিত সরবরাহব্যবস্থার বাইরে সার চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল কৃষক বাড়তি দাম দিয়ে সার সংগ্রহ করতে পারলেও অনেকের পক্ষে এক-দুই বস্তা সার কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, ডিলার ও অবৈধ সার বিক্রেতাদের একটি চক্রের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা সত্যতা যাচাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামের বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকদের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান দাবি করেছেন, রাজশাহী অঞ্চলে সার সংকটের খবর তাদের কাছে নেই। প্রকাশিত বরাদ্দ তালিকার তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ও আগস্টে রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দ বরং বাড়ানো হয়েছে। তার ভাষ্য, ডিলাররা সার উত্তোলন করলেও কোথাও কোথাও মজুত নেই বলে দেখানো হচ্ছে।

বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিনের দাবি, কৃষকরা জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করায় চাহিদা বাড়ছে। তবে সরকারি দামে সার না পাওয়া এবং খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।

এদিকে বিএডিসির এক ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্সের মালিক আব্দুল হক জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান ২০২ বস্তা সার তিন দিনের মধ্যে বিক্রি করেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা দিয়েছে।

আমন মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। তাই সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে, ডিলারদের মজুত ও বিক্রয়প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কেন সার বিক্রি হচ্ছে—এসব বিষয়ে দ্রুত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা চান তারা।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top