নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে ক্রমেই বাড়ছে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। সবজি, মাছসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজিই ৭০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে টমেটো ও গাজরের দাম উঠেছে প্রায় ১৪০ টাকা কেজিতে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা এবং ধনেপাতা ৩০০ টাকা কেজি দরে।
পটল, বেগুন, উচ্ছে, বরবটি, করলা ও কচুর লতির দাম কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে। তুলনামূলক কম দামে পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং চালকুমড়া ও শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
বাজার করতে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কিনলেই বড় অঙ্কের টাকা চলে যাচ্ছে। যাত্রাবাড়ী ও টাউনহল এলাকার কয়েকজন ক্রেতা জানান, মাছ-মাংসের পাশাপাশি সবজির পেছনেও এখন সংসারের বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।
একজন ক্রেতার ভাষ্য, কয়েক ধরনের সবজি এক কেজি করে কিনলেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। মাসের অন্যান্য খরচ মেটানোর পর নিয়মিত বাজার করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশি দামে পাইকারি বাজার থেকে পণ্য কিনতে হচ্ছে তাদের। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকানের খরচ এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি যোগ হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম কমিয়ে বিক্রি করা তাদের পক্ষে কঠিন।
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। দেশি মাছের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকায় পাবদা, টেংরা, শিং, মাগুর, শোল, চিতল ও বোয়ালের মতো মাছের দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এসব মাছের বিভিন্ন প্রজাতি ও আকারভেদে কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। ছোট কাচকি মাছের দামও ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে।
দেশি মাছের উচ্চমূল্যের কারণে অনেকে চাষের মাছ কিনছেন। কিন্তু সেখানেও দাম খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। বাজারে পাঙাশ ২০০ থেকে ২৮০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০ থেকে ৩০০ টাকা এবং রুই-কাতলা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছ কিনতে আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, আগে যেসব মাছ নিয়মিত কেনা সম্ভব ছিল, এখন সেগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প বেছে নিতে হচ্ছে। তাতেও সংসারের খাদ্য ব্যয়ের চাপ কমছে না।
শ্যামবাজারের মাছ বিক্রেতাদের মতে, প্রাকৃতিক জলাশয়ে দেশি মাছের প্রাপ্যতা আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে চাষের মাছ উৎপাদনে খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেগুলোর দামও ঊর্ধ্বমুখী।
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভোক্তারা। তাদের অভিযোগ, আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় তার তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে। মাসের শুরুতে বাজারের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ চলে যাওয়ায় শেষদিকে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যও বাদ দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশ মনে করছেন, শুধু খুচরা বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
ভোক্তা ও বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, উৎপাদন, আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি থাকতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট তৈরি, অতিরিক্ত মুনাফা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়ম বন্ধ এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে সাময়িক অভিযান চালিয়ে নিত্যপণ্যের দাম স্থায়ীভাবে মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা কঠিন হবে।