এলএনজি কার্গো সংকটে ফের গ্যাসের শঙ্কা, জরুরি ভিত্তিতে ৫ কার্গো কিনবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সেখানে সরবরাহ করার মতো কোনো এলএনজি কার্গো নেই। ফলে আগামী ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, টার্মিনালটি এখন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে। কিন্তু পর্যাপ্ত এলএনজি না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, সামনে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ছয়টি এলএনজি কার্গো আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব কার্গোর কয়েকটি নির্ধারিত সময়ে না আসায় এখন স্পট মার্কেট থেকে বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে রোববার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পাঁচটি কার্গো কেনার জন্য জরুরি দরপত্র আহ্বান করেছে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। প্রস্তাবিত কার্গোগুলো ২৩, ২৬ ও ২৯ আগস্ট এবং ১ ও ৪ সেপ্টেম্বর সরবরাহ করার কথা রয়েছে। দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য স্বল্প সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসব কার্গো দ্রুত অনুমোদনের লক্ষ্যে রোববার সন্ধ্যায় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনলাইনে জুম প্ল্যাটফর্মে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসের শুরুতে তিনটি কোম্পানির কাছ থেকে ছয়টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ব্লেক কিউব, মেক্স অয়েল ও জিং হু শিপিং—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দুটি করে কার্গো সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। প্রতিটি কার্গোর আনুমানিক মূল্য ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত দামের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। ব্লেক কিউব প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য ১৩ ডলার, মেক্স অয়েল ২১ ডলারের কিছু বেশি এবং জিং হু শিপিং ১৬ ডলারের প্রস্তাব দেয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ২২ ডলারের বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এসব কার্গো কেনার প্রস্তাব ৬ আগস্ট অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে একটি কার্গো রোববার দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সেটি আসছে না বলে জানা গেছে। ২৩ আগস্ট নির্ধারিত আরেকটি কার্গোর সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এর আগে ১৭ ও ২৪ আগস্ট সরবরাহের জন্য স্পট মার্কেট থেকে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের কার্গো কেনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ওই প্রস্তাব অনুমোদন না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা ছয়টি কার্গো আগে আনার নির্দেশ দেয়। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত কার্গোগুলো সময়মতো না আসায় বিকল্প হিসেবে আবারও স্পট মার্কেটে ফিরতে হচ্ছে সরকারকে।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২১ জুলাই থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এলএনজি সরবরাহে নতুন করে ঘাটতি দেখা দিলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

রোববার সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে পেট্রোবাংলা জাতীয় গ্রিডে মোট ২২৮ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। আগের দিন সরবরাহ ছিল ২৪০ কোটি ঘনফুটের বেশি। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজির মজুত কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহও ধীরে ধীরে কমছে বলে জানা গেছে।

গ্যাস সংকটের মধ্যেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তুলনামূলক বেশি গ্যাস বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট সরবরাহের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৯৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। শিল্প খাতে বরাদ্দ প্রায় ৯০ কোটি ঘনফুট, সার কারখানায় প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট এবং অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য খাতে সরবরাহ করা হয়েছে।

তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমায় লোডশেডিং পরিস্থিতিতে সাময়িক স্বস্তি এসেছে। রোববার বিকেল ৫টার দিকে সারা দেশে লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩৬৫ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩১৫ মেগাওয়াট এবং উৎপাদন ও সরবরাহ মিলিয়ে দেওয়া হয় প্রায় ১৩ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত নতুন এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা না গেলে টার্মিনাল প্রস্তুত থাকার পরও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে না। এতে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতে আবারও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top