নিজস্ব প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ১২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আইনি নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আদালত অবমাননার অভিযোগে কমটেম্পট নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
বেলার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংস্থাটির প্রধান সমন্বয়কারী তাসলিমা ইসলাম এসব নোটিশ পাঠান। বেলা চট্টগ্রামের সমন্বয়ক মুনীরা পারভীন রুবা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নোটিশে শিল্প, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিবাদী করা হয়েছে। এর মধ্যে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক রয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহসীন চৌধুরী এবং ফেরদৌস স্টিলের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদকেও নোটিশের আওতায় আনা হয়েছে।
নোটিশে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় ও নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য তিন দিনের মধ্যে জানাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে ইয়ার্ড মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বেলা।
বেলার অভিযোগ, ফেরদৌস স্টিল কালো তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানি করেছে। অথচ জাহাজভাঙা শিল্পে এ ধরনের জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ রয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর যথাযথ তদারকির ঘাটতি এবং দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণেই এসব অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
বেলা জানিয়েছে, ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে এর আগেও একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অন্তত ছয়টি দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় অন্তত তিন শ্রমিকের মৃত্যু এবং আরও তিনজনের গুরুতর আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, নিহত ও আহতদের অনেকেই ছিলেন নতুন শ্রমিক এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই নিয়োজিত ছিলেন।
জাহাজভাঙা শিল্প নিয়ে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নির্দেশনার কথাও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত থাকার সনদ নিশ্চিত করা, কালো বা ছাই তালিকাভুক্ত দেশ থেকে জাহাজ আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ইয়ার্ড পরিচালনা না করার নির্দেশনা রয়েছে।
বেলার ভাষ্য, আদালতের এসব নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যথাযথ নজরদারি ছাড়াই জাহাজভাঙার কার্যক্রম চলেছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা আদালতের নির্দেশনা অমান্যের পর্যায়ে পড়তে পারে।
এদিকে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বেলা। সংগঠনটির মতে, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিল্প মন্ত্রণালয় জাহাজ আমদানি ও ভাঙার অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এসব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব থাকা তদন্ত কমিটি থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিবেদন পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে বেলা। একই সঙ্গে ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে ঘটে যাওয়া সব মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি করা হয়েছে।
নোটিশে ইয়ার্ডটি বন্ধ, এর অনুমোদন ও লাইসেন্স বাতিল, সব ধরনের অনাপত্তিপত্র প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়াসহ মোট আট দফা দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি দায়ীদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা এবং পাসপোর্ট জব্দের মতো পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি করেছে সংগঠনটি।