নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা (একিউআইএস) সেল গঠনের চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ওই প্রতিবেদন এখনো আমলে নেওয়া হয়নি।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি এখনো জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি পড়েননি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি যতটুকু জেনেছেন, সেখানে বাংলাদেশের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেগুলো নিশ্চিত তথ্যের পরিবর্তে সম্ভাবনা বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অনুমাননির্ভর কোনো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে না পড়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতেও তিনি রাজি নন।
সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের একটি প্রতিবেদনে আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএসের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। ১০ আগস্ট প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৯ জুন পর্যন্ত সময়ের পরিস্থিতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার সাংগঠনিক সক্ষমতা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে বজায় রয়েছে। সংগঠনটির ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা একিউআইএসও আগের তুলনায় ভিন্ন কৌশলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বড় সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন সেল, লজিস্টিক সহায়তা এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার দিকে তারা বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে একিউআইএসের ছোট সাংগঠনিক ইউনিট বা সেল প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মনিটরিং টিম। সংগঠনটি বাংলাদেশকে তাদের কর্মকাণ্ডের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে একিউআইএসের কর্মকাণ্ডের উদাহরণ হিসেবে ভারতের দিল্লির লাল কেল্লায় হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা, আন্তসীমান্ত সংঘাত এবং এসব গোষ্ঠীর সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একিউআইএসের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ আফগানিস্তানের কাবুলে অবস্থান করছে। তাদের তালেবান সরকারের দেওয়া পরিচয়পত্র বা তাজকিরা পাওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তালেবান ও একিউআইএসের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে প্রতিবেদনে একিউআইএসকে এখনো জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত সংগঠন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির সঙ্গে অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর সম্ভাব্য যোগাযোগ এবং পাকিস্তানে সংঘটিত কয়েকটি হামলার কথাও এতে উঠে এসেছে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্তপারের সংঘাত অব্যাহত থাকায় পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তাজনিত চাপ রয়ে গেছে। তালেবান সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) সমর্থন দিচ্ছে—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি তালেবান কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করে আসছে।
জাতিসংঘের বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে, আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এর সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র ও জঙ্গি সংগঠন নিজেদের কার্যক্রম বিস্তারের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হলো, অনুমান বা সম্ভাবনার ভিত্তিতে তৈরি কোনো তথ্যকে সরাসরি বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রতিবেদনটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে পরবর্তী অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে।