৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট, আজ সংসদে লড়াই ফখরুল-অলির

নিজস্ব প্রতিনিধি:

দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যকে ভোটার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-৪ আসন শূন্য থাকায় ৩৫০ আসনের সংসদে ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪৯। নির্বাচনে জয়ী হতে একজন প্রার্থীকে কমপক্ষে ১৭৫টি ভোট পেতে হবে।

তবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিএনপি ও তাদের জোটের সংসদ সদস্যের সংখ্যা প্রয়োজনীয় ভোটের চেয়ে অনেক বেশি।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বশেষ সংসদে রাষ্ট্রপতি পদে ভোটাভুটি হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাস আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুদ্দোজা হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেন। এরপর থেকে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার হিসেবে সংসদ সদস্য হওয়ায় মির্জা ফখরুল নিজেও ভোট দিতে পারবেন। তবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে এবং মন্ত্রিত্ব থেকেও তার পদত্যাগ কার্যকর হবে।

আগামী শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাকে শপথ পাঠ করাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য না হওয়ায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। সংসদ কক্ষেও তার প্রবেশের সুযোগ থাকছে না।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই।

সংসদ কক্ষে চারটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। ভোটগ্রহণ হবে প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে। ব্যালটে ভোটারের নাম এবং তিনি কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা উল্লেখ থাকবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তারা সংসদ কক্ষে নির্ধারিত স্থানে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোটের আগে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসে সহায়তাকারী কর্মকর্তার কাছ থেকে নাম ও বিভক্তি নম্বরযুক্ত ব্যালট সংগ্রহ করতে হবে। এরপর নির্ধারিত নিয়মে ব্যালটে ভোট দিয়ে তা সংসদ কক্ষে স্থাপিত ব্যালট বাক্সে জমা দিতে হবে।

নির্বাচনকে ঘিরে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, ভোট শুরুর পাঁচ মিনিট আগে থেকে লাইভ সম্প্রচার চালু হবে। রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুলের ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি দেখানো হবে। ভোটগ্রহণের শেষ পর্যায় এবং ফলাফল ঘোষণার সময়ও সরাসরি সম্প্রচার থাকবে।

বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে কয়েকজন সংসদ সদস্যের ভোট নিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে।

অসুস্থতার কারণে দেশের বাইরে থাকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারবেন না বলে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। বিষয়টি চিফ হুইপ নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হলেও তার ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে তিনি কাকে ভোট দেবেন কিংবা ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত ভোটের দিন দুপুরে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা আট স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। তাদের ভোট নিজেদের দিকে টানতে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে আইনি চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছিল। প্রচলিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি এবং নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল চ্যালেঞ্জ করে করা রিট বুধবার হাইকোর্ট খারিজ করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন স্থগিতের আবেদনও নাকচ করা হয়।

বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন বলে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন।

তবে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পর রিটকারী আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ আপিল বিভাগে আবেদন করেছেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল নিয়ে তার আপত্তি রয়েছে।

এর আগে গত ২৪ জুলাই দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে।

দীর্ঘ বিরতির পর একাধিক প্রার্থী নিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এবারের ভোটকে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফল ঘোষণার মধ্য দিয়ে আজই স্পষ্ট হয়ে যাবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে কে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top