নিজস্ব প্রতিনিধি:
দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে অনুমোদন ছাড়াই চলছে শত শত স্লিপার কোচ। সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে তৈরি করা এসব যানবাহনের পাশাপাশি অনিবন্ধিত গ্যারেজে স্লিপার বাস নির্মাণ ও মেরামতের অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে চলতি আগস্টে রাজধানীসহ সিলেট ও কক্সবাজারে একাধিক অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; সড়কে চলাচলরত অবৈধ বাসগুলোর বিরুদ্ধেও সমানভাবে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে করা একটি রিটের শুনানিতে বৃহস্পতিবার হাইকোর্টকে বিআরটিএ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। সংস্থাটির দাবি, তারা কোনো স্লিপার বাসকে চলাচলের অনুমোদন দেয়নি।
আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান ২০২৫ সালে স্লিপার কোচের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। তাঁর ভাষ্য, রিটের পর বিআরটিএ আদালতে দেওয়া এফিডেভিটে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কোনো স্লিপার বাস চলাচলের অনুমতি তাদের দেওয়া হয়নি। ফলে রাস্তায় চলমান এসব বাস অনুমোদনহীন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
রিটের ধারাবাহিকতায় গত ২ জুলাই হাইকোর্ট বিআরটিএর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, অনুমোদনহীন বাসগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আদালতকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই বিভিন্ন এলাকায় বিআরটিএর অভিযান জোরদার হয়েছে।
সর্বশেষ বুধবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত-৫ অভিযান পরিচালনা করে। অনুমোদন ছাড়া স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, প্রচলিত বাসের নকশা পরিবর্তন এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এর এক দিন আগে মঙ্গলবার গাবতলীর আমিনবাজার ও মানিকনগর এলাকার বিভিন্ন বডি বিল্ডিং গ্যারেজে অভিযান চালায় বিআরটিএর দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শনের পর অনুমোদনহীন স্লিপার বাস মেরামত ও প্রয়োজনীয় নিবন্ধন না থাকার অভিযোগে চারটি গ্যারেজকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান চলাকালে মেরামতের জন্য থাকা আটটি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়। পাশাপাশি চলাচলের অনুপযোগী দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। ‘নিউ ডিসেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ নামে একটি বডি বিল্ডিং গ্যারেজও সিলগালা করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর বাইরে সিলেটেও অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সিলেট নগরের কদমতলী এলাকায় জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএর যৌথ অভিযানে অনুমোদন ছাড়া স্লিপার বাস সার্ভিস পরিচালনা এবং অন্যান্য অনিয়মের দায়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে পাঁচটি দূরপাল্লার বাসের বিরুদ্ধে মামলা করে আরও ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আসন বিন্যাস বা মূল কাঠামো পরিবর্তন করা আইনত দণ্ডনীয়। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী এ ধরনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর চিত্র বলছে, সমস্যাটি কেবল অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চলাচলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রচলিত বাসকে পরিবর্তন করে স্লিপার কোচে রূপান্তর, নিবন্ধনবিহীন গ্যারেজে এসব যানবাহন তৈরি ও মেরামত এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি অনুমোদন ছাড়া সড়কে নামানোর মতো একাধিক অনিয়ম একই সঙ্গে চলছে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে তিনটি পর্যায়ে কার্যকর করতে হবে—স্লিপার বাস তৈরির গ্যারেজ, মেরামতকেন্দ্র এবং সড়কে চলাচলরত যানবাহন। শুধু উৎপাদন বা মেরামতস্থলে অভিযান চালালে অবৈধ বাসের মূল সমস্যা থেকে যাবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, গ্যারেজে অভিযান চালানো প্রয়োজন হলেও শুধু সেখানেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে ফল পাওয়া যাবে না। কারণ গ্যারেজে তৈরি হওয়া এসব কোচ পরবর্তী সময়ে মহাসড়কে চলাচল করে। তাই গ্যারেজের পাশাপাশি সড়কেও কঠোর নজরদারি দরকার।
তিনি এ ক্ষেত্রে বিআরটিএ, পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি), ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
রিটকারী আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খানের মতে, বিআরটিএ যখন আদালতে জানিয়েছে তারা কোনো স্লিপার বাসকে অনুমোদন দেয়নি, তখন রাস্তায় চলমান প্রতিটি অনুমোদনহীন স্লিপার বাসের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রয়োজন হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা যেতে পারে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, আদালতে অবৈধ স্লিপার বাসের সংখ্যা ৮২৯টি বলে তথ্য দেওয়ার পর সড়কে চলাচলরত প্রতিটি বাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কবে দৃশ্যমান হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে শুধু জরিমানা ও গ্যারেজ সিলগালা নয়, অনুমোদনহীন বাসের রুট পারমিট, নিবন্ধন, কাঠামোগত বৈধতা এবং সড়কে চলাচলের বিষয়টিও সমন্বিতভাবে যাচাই করা জরুরি।