মালয়েশিয়ার ২৫ এজেন্সির তালিকায় ফের সিন্ডিকেটের শঙ্কা, প্রশ্নের মুখে বাছাই প্রক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিনিধি:

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগের মধ্যেই মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়াকে ঘিরে নতুন করে সিন্ডিকেটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাছাই করা এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই জনশক্তি ব্যবসায়ীদের কাছে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত। কী প্রক্রিয়ায় এবং কোন মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি মালয়েশিয়া।

এর আগে ২০১৫ ও ২০২২ সালেও সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে ওঠা চক্র ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়।

নতুন করে একই ধরনের সীমিত এজেন্সি পদ্ধতি চালু হওয়ায় জনশক্তি ব্যবসায়ীদের মধ্যে পুরোনো সংকট ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন তালিকায় সরাসরি কোনো সংসদ সদস্য বা বিএনপির নেতার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান না থাকলেও কয়েকজন সংসদ সদস্য ও একজন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান স্থান পেয়েছে।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত মালিকদের পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘ডামি’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

২৫ এজেন্সি নিয়ে প্রশ্ন

মালয়েশিয়ার ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেওয়া হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটি মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট এটি পরিচালনা করে।

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, ২৫টি এজেন্সি নির্বাচনের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানায়নি। বাছাইয়ের ভিত্তি জানতে মালয়েশিয়ার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর আগে মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি শর্ত পূরণকারী ২৬০টি এবং ছয়টি শর্ত পূরণকারী আরও ১৬৩টি প্রতিষ্ঠান ছিল।

তবে আগের সিন্ডিকেটে যুক্ত থাকার অভিযোগে ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাকি ৩৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে ২৫টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ চাইছে অবশিষ্ট ৩৪৯টি প্রতিষ্ঠানকেও কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হোক।

আগের অভিজ্ঞতাই বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ২৫টি এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন কর্মীপ্রতি নির্ধারিত ব্যয় ছিল প্রায় ৭৯ হাজার টাকা। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত অর্থ, সিন্ডিকেটের চাঁদা ও ভিসা-সংক্রান্ত খরচের কারণে একজন কর্মীর বিদেশযাত্রায় গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছিল বলে মালয়েশিয়ার একটি শ্রম সংগঠনের জরিপে উঠে আসে।

২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। তাদের একটি অংশ প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়ার অভিযোগও করেন। এসব অনিয়মের অভিযোগের পর ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও প্রায় ১৭ হাজার কর্মী শেষ পর্যন্ত দেশটিতে যেতে পারেননি।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এবারও যদি সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগ পরিচালিত হয়, তাহলে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।

বেস্টিনেটকে ঘিরেও পুরোনো বিতর্ক

মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেস্টিনেটের সম্পৃক্ততা নিয়েও অতীতে বিতর্ক হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় নাগরিক। ২০২২ সালে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বেস্টিনেটের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

এর আগে মালয়েশিয়াগামী বাংলাদেশি কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিবন্ধনের ব্যবস্থাপনাতেও বেস্টিনেট যুক্ত ছিল। ওই ব্যবস্থায় কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগের নিয়োগব্যবস্থায় যেসব ব্যক্তি শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাদের প্রভাব এবারও পুরোপুরি শেষ হয়নি। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামের দাবি, আগের সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের প্রতিষ্ঠান নতুন তালিকাতেও জায়গা পেয়েছে।

নেপালও আপত্তি জানিয়েছে

শুধু বাংলাদেশ নয়, মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানো অন্যান্য দেশ থেকেও সীমিতসংখ্যক এজেন্সি নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এফডব্লিউসিএমএস নেপালের জন্য ২৫টি, ভারতের জন্য ১০টি এবং পাকিস্তানের জন্য ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণ করেছে।

নেপাল এই ব্যবস্থায় আপত্তি জানিয়ে সব যোগ্য এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। দেশটির শ্রমমন্ত্রী মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন।

সরকারের বক্তব্য

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কাঠামোর মধ্যেই কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চালাতে হবে।

তিনি জানান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন চেষ্টা করছে যেন যোগ্য সব রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায় এবং আগের মতো সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে পুরো বাজার চলে না যায়।

মন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আগের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ৪৯টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে আরও বেশি এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

তবে নতুন তালিকা ঘিরে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর উদ্যোগটি স্বচ্ছতা ও অভিবাসন ব্যয়—দুই দিক থেকেই নজরদারির মধ্যে থাকবে। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এবার কর্মী নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top