নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে কঠোর আইন, তবু কমছে না সহিংসতা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সেই নজিরের পরও নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রবণতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের পুলিশি পরিসংখ্যান বলছে, এ সময়ে সারাদেশে এ ধরনের ঘটনায় ১২ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মোট ১২ হাজার ৪৪৬টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় হয়েছে ৮৮৬টি মামলা। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৩৩৬টি মামলা হয়েছে। জুনে ২ হাজার ২০০টি, এপ্রিলে ২ হাজার ১১টি এবং মে মাসে ১ হাজার ৯৫২টি মামলা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা দিয়ে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করেন না। ফলে বাস্তবে নির্যাতনের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।

বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা বড় বাধা

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইন থাকলেও বাস্তবে বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মামলায় সাজা হওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পাচ্ছেন।

গবেষণায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩২ জেলার ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে প্রায় তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার তারিখ পড়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

বিচারে বিলম্বের পেছনে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, বারবার সময় চাওয়া, তদন্তে দেরি, দুর্বল প্রমাণ, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব এবং সাক্ষী সুরক্ষার ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক চাপের কারণে মামলা থেকে সরে দাঁড়ানো এবং অভিযুক্তদের প্রভাবও বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ইউনিসেফের উদ্বেগ

দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন ও শারীরিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের যেসব জায়গায় সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেও তারা সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি ঘটনা রিপোর্টিং ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা এবং শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। স্কুল, মাদরাসা, কর্মক্ষেত্র ও পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইন সংশোধনেও জোর

বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকর করতে চলতি বছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে তদন্ত ও বিচারকাজে সময়সীমা নির্ধারণ, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জবাবদিহিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইন সংশোধন করলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা, তদন্তের মান উন্নয়ন, দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আলোচিত কোনো ঘটনা ঘটলেই প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে। কিন্তু প্রান্তিক শ্রেণির নারী ও শিশুরা নির্যাতনের শিকার হলে অনেক ক্ষেত্রে একই মাত্রার গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাঁর মতে, ভুক্তভোগীর সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

শাস্তি দৃশ্যমান করার তাগিদ

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আক্তারের মতে, শুধু গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর হওয়ার বিষয়টিও দৃশ্যমান করতে হবে। তাঁর ভাষায়, বিচার দীর্ঘায়িত হলে সাক্ষ্য ও আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়ানোর ধারণা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. ওমর ফারুকের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন নতুন কোনো প্রবণতা নয়। তবে সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাঁর মতে, অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগেই তা ঠেকাতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সব মিলিয়ে, নারী ও শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় দেশে আইন ও বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের জায়গায় এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে। দ্রুত তদন্ত, কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা, নিরপেক্ষ বিচার এবং অপরাধীর দৃশ্যমান শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করা না গেলে শুধু আইন প্রণয়ন করে এই সহিংসতা ঠেকানো কঠিন হবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top