নতুন সরকারের ছয় মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তির চেয়ে উদ্বেগ বেশি: সিপিডি

নিজস্ব প্রতিনিধি:

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রে সংকট ও নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির পর্যালোচনায় রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সূচকে দুর্বলতা উঠে এসেছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে সিপিডি আয়োজিত ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যার মধ্যে ছিল। এর সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশও পুরোপুরি অনুকূলে ছিল না। তবে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল না থাকায় বর্তমান সময়ে বিভিন্ন নীতি ও অগ্রগতির মূল্যায়ন জটিল হয়ে পড়েছে।

তাঁর মতে, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা অগ্রগতি হলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।

সিপিডি জানিয়েছে, সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য তারা প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপকে নয়টি খাতে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে কিছু উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হিসেবে রাজস্ব পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বর্তমান প্রবণতা সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

শিল্প খাতেও দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে সিপিডি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। উৎপাদন খাতেও প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সঙ্গে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। সিপিডির মতে, এসব পরিসংখ্যান বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

জ্বালানি সংকটও শিল্প খাতের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, গ্যাস সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। এর প্রভাব পড়েছে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পে।

তবে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতির কথা জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি পরিস্থিতি এখনো নেতিবাচক বলে উল্লেখ করেছে সিপিডি।

বৈদেশিক খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি হিসাবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তও ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে নেমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

সিপিডি সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন সম্প্রসারণ, ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থা জোরদার এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।

এ ছাড়া বিডা, বেজা ও পিপিপিএকে একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, বয়স্ক নাগরিকদের গণপরিবহনে ছাড়, কৃষিঋণে সুবিধা এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর মতো উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং অকার্যকর পাঁচটি এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন-২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি।

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে সিপিডি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ সময়ের জন্য একটি ‘কোর বাজেট’ প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংকিং, রাজস্ব, এনবিআর, সরকারি ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কাঠামো নিয়ে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত এবং সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার ওপরও জোর দিয়েছে সিপিডি। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ, বেতন কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top