তারেক রহমানকে দিল্লিতে নিতে আগ্রহী ভারত, হাসিনার উপস্থিতিতে জটিল সমীকরণ

নিজস্ব প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লির আগ্রহের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় সম্ভাব্য এই সফরটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন এক সংবেদনশীল মাত্রা যোগ করেছে।

চলতি আগস্টের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো একটি বার্তায় জানানো হয়েছিল, নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। কারণ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর মহড়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে সফরের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকায় সেই বার্তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএমএম সালেহ জানিয়েছেন, সফর নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বড় জয়ের পর সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের জন্য এটি হবে বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক সফর। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে নতুন সম্পর্কের ভিত্তি তৈরিতে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে টানাপোড়েন

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম বড় জটিলতা হয়ে রয়েছে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগে বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানানো হলেও ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সঙ্গে হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটিও স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ায় বাংলাদেশে ক্ষোভ তৈরি হয়। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে এবং বাংলাদেশের সাংবিধানিক সরকারের বিষয়ে করা মন্তব্যকে সমর্থন করে না বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দিল্লি সফর দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।

দিল্লির বাড়তি আগ্রহ কেন

তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারতীয় পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।

তারেক রহমান দিল্লি সফরে গেলে তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার। প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতাকে ঘিরে ভারতের এমন প্রকাশ্য আগ্রহকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ মনে করেন, হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করলেও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে দিল্লি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা ভিসা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যসংক্রান্ত কয়েকটি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার উদ্যোগ তারই অংশ।

দুই দেশের স্বার্থের জায়গা অনেক

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগেও দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। গত বছর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সম্পর্কের অবনতি কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে সুবিধাজনক নয়।

তবে হাসিনার পতনের পর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও স্পষ্ট। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা দিল্লির নজরে রয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়েও নজর

হাসিনা সরকারের সময়ে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ বেড়েছে। সামরিক পর্যায়ে সফর বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা ভারতের জন্য নতুন একটি কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এর পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। ঢাকার পক্ষ থেকে মুসলিম দেশগুলোর কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, এ ধরনের প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার আগে ঢাকার সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা উচিত। শুধু ভারতকে বিরক্ত করার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই বিবেচনার মূল বিষয় হওয়া উচিত।

দিল্লি সফরের সম্ভাব্য সময়

কূটনৈতিক মহলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে কিংবা সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনকে সম্ভাব্য যোগাযোগের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক প্রয়োজন। সে দিক থেকে তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে তা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।

তবে সফরের আগে হাসিনার প্রত্যর্পণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো—এসব বিষয় ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লি নতুন বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে আগ্রহী হলেও ঢাকার অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমুখী। তাই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু দুই দেশের সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল কূটনৈতিক সমীকরণে এর প্রভাব পড়তে পারে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top