ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল কারেন্সি: অর্থের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল কারেন্সি: অর্থের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

তানজিম হোসেন, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়:

একসময় অর্থের পরিচয় ছিল কাগজের নোট, ধাতব মুদ্রা আর ব্যাংকের খাতায় লেখা কিছু সংখ্যা। সময় বদলেছে। এখন অর্থের একটি বড় অংশের কোনো কাগুজে অস্তিত্ব নেই, অথচ তা দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে লেনদেন সম্ভব। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর তারই প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ভাবছে আরেক ধরনের ডিজিটাল অর্থের কথা, যাকে বলা হচ্ছে Central Bank Digital Currency বা CBDC।

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত এমন এক ধরনের ডিজিটাল সম্পদ, যা সাধারণত কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে না। বিটকয়েন এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি লেনদেন যাচাই ও সংরক্ষণের দায়িত্ব থাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে সেই দায়িত্ব অনেকাংশে পালন করে Blockchain প্রযুক্তি। এটি এমন একটি বিতরণকৃত ডিজিটাল হিসাবখাতা, যেখানে লেনদেনগুলো নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কম্পিউটারে যাচাই ও সংরক্ষিত হয়। ফলে কোনো একক প্রতিষ্ঠানকে পুরো ব্যবস্থাটির একমাত্র নিয়ন্ত্রক হতে হয় না।

ক্রিপ্টোকারেন্সির কাজ শুধু অর্থ পাঠানো বা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিনিয়োগের একটি সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করে এবং Blockchain-এর মাধ্যমে স্মার্ট কনট্রাক্ট, টোকেনাইজেশনসহ নানা ধরনের আর্থিক প্রযুক্তির পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীত পিঠও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক ক্রিপ্টো সম্পদের মূল্য অত্যন্ত অস্থির, কিছু সম্পদের পেছনে নির্ভরযোগ্য সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তা নেই এবং বাজারে তথ্যের অসমতা ও প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও সতর্ক করেছে যে ক্রিপ্টো সম্পদের বিস্তার আর্থিক স্থিতিশীলতা, মুদ্রানীতি এবং পুঁজি প্রবাহের ওপর নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

এখানেই ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং CBDC-এর মৌলিক পার্থক্য। CBDC কোনো বেসরকারি ক্রিপ্টো টোকেন নয়; এটি একটি দেশের সরকারি মুদ্রার ডিজিটাল রূপ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইস্যু ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অর্থাৎ বিটকয়েন যেখানে রাষ্ট্রের বাইরে একটি বিকল্প আর্থিক কাঠামোর স্বপ্ন দেখায়, CBDC সেখানে রাষ্ট্রীয় মুদ্রাব্যবস্থাকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টা।

বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক অবস্থান এই পরিবর্তনের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। Bank for International Settlements বা BIS-এর ২০২৪ সালের জরিপে ৯৩টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে ৮৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ, খুচরা CBDC, পাইকারি CBDC অথবা উভয় ধরনের CBDC নিয়ে কাজ করছিল।

এই পরিসংখ্যান নিছক একটি সংখ্যা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বুঝতে পারছে, অর্থনীতি যখন ক্রমেই ডিজিটাল হচ্ছে, তখন শুধু কাগজের নোট ও প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের আর্থিক বাস্তবতাকে সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

তবে CBDC নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ মানেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে গ্রহণ করা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি তার বিপরীত। BIS-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রিপ্টো ও স্টেবলকয়েনের বিকাশকে পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি নিজেদের ডিজিটাল মুদ্রা ও আধুনিক পেমেন্ট অবকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।

কারণটি গভীর। একটি দেশের মুদ্রা শুধু লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বেরও প্রতীক। মানুষ যদি ব্যাপকভাবে এমন কোনো বেসরকারি ডিজিটাল সম্পদ ব্যবহার করতে শুরু করে যার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে অর্থ সরবরাহ, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। IMF-এর নীতিগত অবস্থানও হলো, ক্রিপ্টো সম্পদকে সরকারি মুদ্রা বা আইনগত দরপত্রের মর্যাদা না দেওয়াই মুদ্রা সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য অধিক নিরাপদ।

তবে ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনাও কম নয়। দ্রুত ও সাশ্রয়ী পেমেন্ট, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের দক্ষতা এবং নতুন ধরনের ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো তৈরিতে CBDC ভূমিকা রাখতে পারে। IMF-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সঠিকভাবে নকশা করা CBDC আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এবং কিছু ক্ষেত্রে ডলারাইজেশন বা ক্রিপ্টোাইজেশনের চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। ডিজিটাল অর্থের যুগে নাগরিকের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা হবে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা তথ্য দেখতে পারবে? সাইবার আক্রমণ হলে কী হবে? মানুষ যদি ব্যাংকের আমানতের বদলে CBDC-তে বিপুল অর্থ রাখে, তাহলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা কি চাপে পড়বে? এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর এখনো তৈরি হয়নি।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল লেনদেনের দিকে এগোলেও নগদ অর্থের ব্যবহার এখনো ব্যাপক। ফলে ভবিষ্যতের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের গোপনীয়তা, আর্থিক সাক্ষরতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ক্রিপ্টোকারেন্সি থাকবে কি থাকবে না, কিংবা CBDC আসবে কি আসবে না, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আগামী দিনের অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এবং প্রযুক্তি সেই ব্যবস্থাকে কতটা বদলে দেবে।

সম্ভবত ভবিষ্যতের অর্থনীতি কাগজের নোটকে পুরোপুরি বিদায় দেবে না, আবার ক্রিপ্টোকারেন্সিকেও একদিনে মুছে ফেলবে না। বরং রাষ্ট্রীয় মুদ্রা, ব্যাংক আমানত, স্টেবলকয়েন, ক্রিপ্টো সম্পদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা পাশাপাশি অবস্থান করবে। সেই বহুমাত্রিক আর্থিক জগতে বিজয়ী হবে সেই দেশ, যে প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ, নীতি ও জনস্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারবে।

অর্থের ইতিহাসে প্রতিটি যুগ পরিবর্তনের আগে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। এবার প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট: টাকার ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের হাতে থাকবে, নাকি অ্যালগরিদমের হাতে? উত্তরটি নির্ধারণ করবে শুধু অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার পরবর্তী অধ্যায়ও।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top