নিজস্ব প্রতিনিধি:
এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল সে। জন্মের মুহূর্তেই হারিয়েছিল মা, বাবা ও বড় বোনকে। তবু জীবন থেমে থাকেনি। সেই নবজাতক ফাতেমা আজ চার বছরে পা দিয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে বেড়ে উঠছে সে, যেখানে অন্য শিশুদের মতোই তার দিন কাটছে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দে।
২০২২ সালের ১৬ জুলাই ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ঘটে হৃদয়বিদারক একটি দুর্ঘটনা। একটি দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম, তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম এবং তাদের ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা। দুর্ঘটনার মধ্যেই চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় রত্নার গর্ভ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় একটি কন্যাশিশুকে। পরে তার নাম রাখা হয় ফাতেমা।
চার বছর কেটে গেলেও ফাতেমা এখনো জানে না তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি। ছোট্ট মেয়েটি মাঝেমধ্যেই জানতে চায়, তার বাবা-মা কোথায়। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এত অল্প বয়সে এমন নির্মম বাস্তবতা জানালে সে মানসিকভাবে আঘাত পেতে পারে। তাই সময় উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে পুরো ঘটনা জানানো হবে না।
ফাতেমার দাদা মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, নাতনি এখনো নিষ্পাপ শিশু। অন্য বাচ্চাদের মতো সেও বাবা-মায়ের কথা জানতে চায়। তবে সত্য জানার মতো বয়স এখনো হয়নি।
দুর্ঘটনার পর পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। তার মৃত্যুর পর বৃদ্ধ বাবা-মা, সন্তান এবং অন্যান্য স্বজনদের নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় পরিবারকে। পরে বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তাদের পাশে দাঁড়ানো হয়।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বিভিন্ন মহল থেকে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা পাওয়ায় তাদের সংকট কিছুটা কমেছে। ফাতেমার স্মৃতিকে ধরে রাখতে তাদের এলাকার একটি সড়কের নামও ‘ফাতেমা রোড’ রাখা হয়েছে। এছাড়া পরিবারের জন্য একটি নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজও চলছে বলে তারা জানান।
বর্তমানে ফাতেমা আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো শিশুকে স্থায়ীভাবে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। তাই আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে তার দাদা-দাদিকে।
মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা নাতনিকে একদিন নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নিজের স্নেহে বড় করা। তিনি চান, জীবনের শুরুতে এত বড় শোক বয়ে বেড়ানো শিশুটির ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও সুন্দর হয়।
ছোটমণি নিবাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফাতেমার সার্বিক পরিচর্যায় কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। নিয়মিত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার এবং খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে সে। অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছে ছোট্ট এই মেয়েটি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিবার সম্পর্কে তার কৌতূহলও বাড়ছে।
চার বছর আগে যে দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, আজও সেই স্মৃতি অনেকের মনে জাগরুক। ফাতেমার জীবন যেন একই সঙ্গে শোক ও আশার প্রতীক—একদিকে একটি পরিবারের মর্মান্তিক সমাপ্তি, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও নতুন জীবনের জেগে ওঠার এক বিরল উদাহরণ।
আজ চার বছরে পা রাখা ফাতেমা হয়তো এখনো জানে না তার জন্মের পেছনের ইতিহাস। কিন্তু তার বেড়ে ওঠা মনে করিয়ে দেয়, সবচেয়ে কঠিন অন্ধকারের মধ্যেও জীবনের আলো নিভে যায় না।