জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল, এমপি পদ থাকবে কি না—সংবিধান ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কি না—এ প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনবিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা সামনে এনে এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে।

বুধবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির বিষয়ে পরিচালিত সাংগঠনিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলেও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, কোনো সদস্য সংগঠনের নীতিমালা ও নৈতিক মানদণ্ড লঙ্ঘন করলে তার সদস্যপদ বাতিল কিংবা প্রয়োজনে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। তার ভাষ্য, বহিষ্কার মানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সংগঠনের সব ধরনের সম্পর্কের অবসান।

তবে এই বহিষ্কার সংসদ সদস্যপদে কী প্রভাব ফেলবে, সে বিষয়ে একক মত পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়া মাত্রই সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয় না। তার মতে, নৈতিক স্খলনের অভিযোগ সংসদীয় তদন্তে প্রমাণিত হলে তবেই পরবর্তী সাংবিধানিক পদক্ষেপের প্রশ্ন উঠতে পারে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কাউকে বহিষ্কার করা যেতে পারে, কিন্তু সংসদ সদস্যপদ হারানোর সাংবিধানিক শর্ত আলাদা। তিনি উল্লেখ করেন, দলত্যাগ, সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া অথবা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালতের রায়ে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড হলে সদস্যপদ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ‘নৈতিক স্খলন’ কী ধরনের অপরাধকে বোঝায়, সে বিষয়ে আইন বা আদালতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মত ভিন্ন। তিনি বলেন, নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দলীয় বহিষ্কারের ঘটনায় সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হতে পারে এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তিনি অতীতের একটি সংসদীয় নজিরের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে দলীয় সিদ্ধান্তের পর একজন সংসদ সদস্য শেষ পর্যন্ত পদ হারিয়েছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরও সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশ করে বলেন, বহিষ্কারের পর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যপদ নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

তবে আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলত্যাগ, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ভোটদান থেকে বিরত থাকার বিষয় উল্লেখ থাকলেও ‘দল থেকে বহিষ্কার’কে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শুধুমাত্র বহিষ্কারের ভিত্তিতে সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পরও প্রয়োজনে বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, পুরো ঘটনার সত্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়া যাচাইয়ের পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত হবে। তিনি জানান, আদালতের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন, সে ক্ষেত্রে আসন শূন্য ঘোষণা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপনির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।

উল্লেখ্য, বুধবার বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে গাজী নজরুল ইসলামকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলটির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হবে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top