রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত পরীক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় অবরুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও বিষয়টির সঠিক তদন্তে বিভাগীয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল গঠিত হয়েছে এবং বিতর্কিত নিয়োগের ফলাফল স্থগিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে বিভাগীয় উচ্চপর্যায়ের এক তদন্ত দল। রংপুর বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালক জিলুফা সুলতানা এবং লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রাসেল মিয়ার তাঁর সফর সঙ্গী হিসেবে এ তদন্তে সরেজমিনে পাটগ্রামে অবস্থান করছেন। তারা নিয়োগ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন।
স্থানীয় ও নিয়োগপ্রার্থী সূত্রে জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার বাছাইয়ের উদ্দেশ্যে গত ২৫ জুলাই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এরপর ৬ আগস্ট সন্ধ্যায় ফলাফল ঘোষণা করা মাত্রই বঞ্চিত প্রার্থীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
নিয়োগপ্রার্থীদের অভিযোগ, চরম স্বজনপ্রীতি, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা উঠে এসেছে যে, পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত মেধাবী ও যোগ্য পরীক্ষার্থীরা চরম বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।
ফলাফল প্রকাশের পরপরই শত শত ক্ষুব্ধ নিয়োগপ্রার্থী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে জমায়েত হন। তারা এই বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল ও নম্বরপত্র পুনর্বাচাইয়ের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা তত্কালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর শাহরিয়ারকে তাঁর কার্যালয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টারও বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, বিক্ষুব্ধ তরুণরা ইউএনওর মুখোমুখি হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার পূর্ণ স্বচ্ছতা দাবি করছেন। পরবর্তীতে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত ও সমাধানের আশ্বাস দিলে প্রার্থীরা তাঁদের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
ঘটনার পরপরই পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীর শাহরিয়ারকে গত ২৩ জুলাইয়ের বদলির আদেশ অনুযায়ী তাঁর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয় বলে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের দপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে। পাটগ্রাম উপজেলা কার্যালয়ের চলমান কাজ সম্পন্ন করার কারণে তাঁর হস্তান্তরে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল, তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পর আদেশটি দ্রুত কার্যকর করা হয়।
বর্তমানে উপজেলায় প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখতে হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপ-জন মিত্রকে পাটগ্রামের অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
ঘটনাটির সঠিক তদন্তে রংপুর বিভাগ থেকে আগত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত টিম পাটগ্রামে পৌঁছে পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় নথি বিশ্লেষণ শুরু করেছে। তারা নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল তালিকা, ভাইভার নম্বরপত্রসহ প্রশাসনিক সমস্ত রেকর্ড খতিয়ে দেখছেন এবং সাময়িকভাবে চূড়ান্ত ফলাফল স্থগিত রেখেছেন।
এ বিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে পাটগ্রাম) দীপ-জন মিত্র বলেন, “আমাকে পাটগ্রাম উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে রংপুর বিভাগীয় তদন্ত টিম ফলাফল স্থগিত করেছে। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে সঠিক ও নির্ভুল ফলাফল প্রকাশ করবেন।”
রংপুর তদন্ত দলের সূত্রে জানা গেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বঞ্চিতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দৈনিক আমার বাংলাদেশ সাংবাদিক কে জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ ও শুমারি কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হবে না এবং সঠিক ও প্রকৃত মেধা সম্পন্ন প্রার্থীরাই নিয়োগ পাবেন।