মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের। চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকেই শুনতে হচ্ছে—‘ডাক্তার নেই, পরে আসেন।’ ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছে এটি যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিনের চিকিৎসক সংকট কাটাতে গত ৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে ১২ জন চিকিৎসককে পদায়ন করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে জেলার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, নতুন চিকিৎসকরা যোগ দিলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় গতি ফিরবে। কিন্তু সেই আশা স্থায়ী হয়নি এক মাসও।
পদায়নের অল্প সময়ের মধ্যেই সুপারিশ ও বদলির মাধ্যমে পাঁচজন চিকিৎসক অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে আবারও চিকিৎসক সংকটে পড়েছে জেলার প্রধান এই সরকারি হাসপাতালটি। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিনই ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। এর সরাসরি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ রোগীদের।
এক মাসেই বদলি পাঁচ চিকিৎসক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে পদায়ন পাওয়া ১২ চিকিৎসকের মধ্যে মেডিকেল অফিসার, সহকারী সার্জন ও বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসক ছিলেন।
তবে যোগদানের এক মাসের মধ্যেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন ডা. মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. মো. মেহেদী হাসান, ডা. মো. এনামুল হক এবং ডা. অতীশ দীপংকর।
অর্থাৎ নতুন করে পদায়ন পাওয়া চিকিৎসকদের প্রায় ৪২ শতাংশই অল্প সময়ের মধ্যে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।
চিকিৎসক মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে যারা হাসপাতাল ছেড়ে গেছেন, তাদের অনেকেই ওপরের মহলে তদবির ও সুপারিশের মাধ্যমে নিজেদের সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলি নিয়েছেন।
এখনও যোগ দেননি কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পরবর্তীতে আরও একজন মেডিসিন ও একজন কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্টকে পদায়ন করা হয়। তবে কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সফিকুল ইসলাম এখনও রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে যোগদান করেননি।
ফলে হৃদরোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ কার্যত চিকিৎসক সংকটেই রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে শূন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সার্জারি, মেডিসিন, শিশু, কার্ডিওলজি, গাইনি, চর্ম ও যৌনরোগ, ফরেনসিক মেডিসিন, অর্থোপেডিক সার্জারি, ইএনটি (নাক-কান-গলা) এবং অ্যানেস্থেসিয়া বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্টের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
এ ছাড়া চক্ষু, কার্ডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্টের পদও খালি রয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বহির্বিভাগে রোগীদের দীর্ঘ সারি। বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ রোগীর ভিড় বাড়তে থাকে।
চক্ষু বিভাগের চিকিৎসক ডা. অপূর্ব রায়ের কক্ষের সামনেও রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তিনি ইনডোরে ভর্তি রোগীদের রাউন্ডে থাকায় নির্ধারিত সময়ে বহির্বিভাগে রোগী দেখা শুরু করতে পারেননি। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যান।
সত্তরোর্ধ্ব মজিবর প্রামাণিক চোখের চিকিৎসার জন্য দূর থেকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে না পেয়ে চিকিৎসা না নিয়েই ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয় তাকে।
শুধু মজিবর প্রামাণিক নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আশায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকেই আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও বেশি খরচ করে ফরিদপুর কিংবা ঢাকায় চিকিৎসা নিতে ছুটছেন। একজন চিকিৎসককে সামলাতে হচ্ছে একাধিক দায়িত্ব।
হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক জানান, রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে একেকজন চিকিৎসককে একই সঙ্গে বহির্বিভাগ, ইনডোর ও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, অতিরিক্ত ডিউটি করার পরও প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে একজন রোগীকে মাত্র দুই-তিন মিনিট সময় দিতে হচ্ছে। এতে রোগ নির্ণয় ও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, “মন্ত্রীর নির্দেশে আমরা ১২ জন চিকিৎসক পেয়েছিলাম। কিন্তু যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই পাঁচজন বদলি হয়ে চলে যান। পরে অধিদপ্তর থেকে আরও দুজন চিকিৎসক পদায়ন করা হলেও এখন পর্যন্ত একজন যোগদান করেননি। বিষয়টি লিখিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।”
চিকিৎসকদের বদলির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোন কারণে তারা হঠাৎ বদলি নিয়ে চলে গেছেন, তা আমার জানা নেই। নিশ্চয়ই তারা বদলির আবেদনে নিজ নিজ কারণ উল্লেখ করেছেন।”
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে চিকিৎসক পদায়ন করলেই রাজবাড়ীর মতো জেলাগুলোর চিকিৎসক সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। চিকিৎসকদের পদায়নের পর যেন তারা অল্প সময়ের মধ্যেই অন্যত্র বদলি হয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
তাদের মতে, প্রত্যন্ত ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ধরে রাখার জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বারবার চিকিৎসক পদায়ন ও বদলির একই চক্র চলতে থাকবে এবং দিন দিন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে।