নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরে নতুন করে নেতৃত্বের সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে—এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
মির্জা ফখরুল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে গেলে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন, তা নিয়েও দলটির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের নাম।
দলীয় ও রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে মির্জা ফখরুলকে দলীয় পদ ছাড়তে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে রিজভীকে মহাসচিব পদে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখছেন দলের অনেক নেতা।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন কিংবা পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে রিজভীর নাম—কোনোটিই এখন পর্যন্ত বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ হিসেবেই রয়েছে।
রিজভী নিজেও মহাসচিব পদ নিয়ে চলমান আলোচনা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য রেখে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন এবং ভবিষ্যতে তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও নীতিনির্ধারকরাই নেবেন।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় রিজভীর পক্ষে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ। দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রয়েছেন।
বিএনপির বর্তমান কাঠামোতেও সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব পদটি মহাসচিবের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নজির রয়েছে। মির্জা ফখরুল নিজেও ২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন।
রিজভীর রাজনৈতিক পথচলাও দীর্ঘ। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পর তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—রাকসুর সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
এরপর বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ২০১৬ সালে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব নির্বাচিত হন রিজভী। দলীয় নির্বাচন পরিচালনাসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের মতে, দলের সংকটকালীন সময়ে রিজভীর সক্রিয় উপস্থিতি তাকে আলাদা অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি দলীয় কার্যালয়কেন্দ্রিক সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
বিশেষ করে বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক সময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান এবং দলীয় কর্মসূচিতে তার সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি দলের ভেতরে তার সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে বলে মনে করেন কয়েকজন নেতা। বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখি হলেও দলীয় কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয়তা অব্যাহত ছিল বলেও দলীয় সূত্রগুলো উল্লেখ করছে।
তবে মহাসচিব পদে রিজভীর সম্ভাব্যতার পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও আগে আলোচনায় ছিল। বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই দুই নেতার সাংগঠনিক ব্যস্ততার কারণে রিজভীর নাম তুলনামূলকভাবে বেশি সামনে এসেছে বলে দলীয় পর্যায়ের কয়েকজন মনে করছেন।
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও রিজভীর সাংগঠনিক যোগাযোগকে তার অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অবস্থান করেও দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে—এমন দাবি দলটির কয়েকজন নেতার।
এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। দলের মহাসচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়টি দলের স্থায়ী কমিটি প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সম্ভাব্য পরিবর্তনের যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করছে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে মহাসচিব পদে রিজভীর সম্ভাবনা কতটা বাস্তব রূপ নেয়, সেটিই এখন বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন।