তীব্র গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং, ঘাটতি ছাড়াল ৩,৬০০ মেগাওয়াট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

তীব্র গরমের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ঘাটতি বেড়েছে। ফলে রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। কোথাও কোথাও দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি লোডশেডিং হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকাল ৩টায় জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) হিসাব বলছে, রোববার বিকাল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। পরে বিকাল ৫টার দিকে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও তখনও ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।

পিডিবি বলছে, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি কয়লার সংকট ও বিভিন্ন কেন্দ্রের যান্ত্রিক সমস্যাও উৎপাদন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর সঙ্গে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়া। সাধারণত পিক আওয়ারে আদানি কেন্দ্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও রোববার বিকাল ৫টায় সরবরাহ ছিল মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট।

পিডিবির কাছে আদানি জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহণ ব্যাহত হওয়ায় তাদের মজুত কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমাতে হয়েছে। তবে পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদানির দেওয়া তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ তাদের নেই।

দেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়া, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপালসহ কয়েকটি কেন্দ্র কয়লা সংকট বা যান্ত্রিক সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট হলেও রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে উৎপাদন ছিল প্রায় ৭১০ মেগাওয়াট।

গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এর ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

রোববার বিকাল ৫টার হিসাবে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম ছিল।

পিডিবির হিসাবে, গ্যাসের ঘাটতিতে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা ও অন্যান্য সমস্যার কারণে আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কম হচ্ছে। ফলে মোটামুটি ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি জাতীয় গ্রিডে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

এলএনজি সরবরাহ বাড়ার অপেক্ষা

বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে।

মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে টার্মিনালটি আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে। তবে রোববার সন্ধ্যা ৬টায় দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মিলিয়ে সরবরাহ ছিল প্রায় ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে এই দুই টার্মিনাল থেকে প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।

সংশ্লিষ্টদের আশা, সব প্রস্তুতি ঠিক থাকলে সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। সেটি হলে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় সরবরাহ কবে নিশ্চিত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে তীব্র গরমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার মধ্যে গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতির বিষয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top