মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
পোল্ট্রিখাতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যার সুনাম ধরে রেখেছে এ উপজেলার হ্যাচারিচ ও খামারীরা। সারাদেশে চাহিদার অর্ধেক সোনালী মুরগির বাচ্চা সরবরাহ করা হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থেকে। হ্যাচারি শিল্পের মালিকেরা জানান, কাচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসানে পড়তে হচ্ছে তাদের, আর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, প্রাণিজ সম্পদ বৃদ্ধি করে চাহিদা মেটানো ও কর্মসংস্থান তৈরিতে গোয়ালন্দ উপজেলা রাখছে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা। বায়োসিকিউরিটির ব্যাপারে করা হচ্ছে তদারকি। বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
জানা গেছে, সারাদেশে মাংস ও ডিমের জোগান দিতে এবং এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে ২০০৩ সালে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় জমিদার ব্রিজ এলাকায় ভিক্টর ফিডস ও ভিক্টর ব্রিভার্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ব্যবসায়ী রুহুল আমিন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পোল্ট্রি খাতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। নিজস্ব খামারের ডিম থেকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক লক্ষ মুরগির বাচ্চা তৈরি হচ্ছে এখানে। যা পাঠানো হচ্ছে সারাদেশের খামারীদের কাছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য মতে রাজবাড়ী জেলায় ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে ৮৬৫ টি, লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে ৫৩৮ টি, সোনালী মুরগীর খামার রয়েছে ৬০৩ টি ও হ্যাচারি রয়েছে ২৯ টি যার ২২ টি হ্যাচারি গোয়ালন্দ উপজেলায়।
ভিকটর ফিডস ও ভিকটর ব্রীডার্স লিমিটেড কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রথমে ভিকটর ফিডস ও ভিকটর ব্রীডার্স লিমিটেড দিয়ে শুরু করা হলেও এখন গড়ে তোলা হয়েছে ভিকটর ভিলেজ নামে বিশাল একটি হ্যাচারি ও খামার। যেখানে বায়োসিকিউরিটি মেনে, প্রাকৃতিক পরিবেশে লালন পালন করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির ব্রয়লার, সোনালী মুরগী। নিজস্ব খামারের বাছাইকৃত ডিম থেকে তৈরি হচ্ছে সোনালী মুরগীর বাচ্চা। প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক লক্ষ মুরগীর বাচ্চা তৈরি হচ্ছে এখানে। যা সারা দেশের খামার পরিচালনায় ভূমিকা রাখছে।
শুধু ভিকটর ফিডস নয়। রয়েছে “গোয়ালন্দ হ্যাচারিজ” “উইনার”সহ আরো ২২ টি ছোট বড় হ্যাচারি রয়েছে রাজবাড়ী গোয়ালন্দ উপজেলায়। যেখান থেকে তৈরি হচ্ছে লাখ লাখ মুরগির বাচ্চা। খামারগুলোতে তৈরি হচ্ছে লাখ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির ব্রয়লার-লেয়ার ও সোনালী মুরগি। এ সকল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। এলাকায় কমেছে বেকারত্ন।
এ সময় খামারে কর্মরত নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম বলেন, জমিদার ব্রীজ এলাকায় ভিকটর ফিডস গড়ে উঠার কারণে এই এলাকায় শতাধিক অবহেলিত নারী শ্রমিক কাজ করে খেতে পারছে। আমরা নারীরা এখানে কাজ করে যে পারিশ্রমিক পাই তা দিয়ে সংসারে স্বামী সহযোগিতা ও সন্তানদের পড়াশোর কাজে যোগান দেই।
ভিকটর ভিলেজের সুপারভাইজার মোঃ ইদ্রিস আলী বলেন, ভিকটর ভিলেজ গড়ে ওঠার কারণে এখানে প্রায় দুই শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এ শ্রমিকেরা খামার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, পানি দেওয়া, মুরগির খাবার দেওয়ার কাজ করে। আমরা সব ধরনের নিয়ম মেনে খামার পরিচালনা করি। মালিকের নির্দেশ দুই টাকা কম কামাই করবো কিন্তু সুনাম ধরে রাখা আমাদের লক্ষ্য।
ভিকটর ফিডস ও ভিকটর ব্রীডার্সের হ্যাচারি ইনচার্জ মোঃ রেজাউল শেখ বলেন, আমাদের খামার থেকে আসা ডিম প্রথমে বাছাই করা হয়। পরে হ্যাচে দিয়ে বাচ্চা ফুটানো হয়। আমাদের এখানকার বাচ্চা মান সম্মত হওয়ায় সারা দেশে আমাদের সুনাম রয়েছে। যে কারণে আমাদের সোনালী মুরগীর বাচ্চার চাহিদা বাড়ছে।
ভিকটর ফিডস ও ভিকটর ব্রীডার্সের জেনারেল ম্যানেজার ওবায়দুর রহমান বলেন, ভিকটরে বর্তমানে তিন ধরনের বাচ্চা তৈরি করা হয়। প্রতি সপ্তাহে দুই বার অন্তত এক লক্ষ্য বাচ্চা উৎপাদন হয়। এখানে ৪০ হাজার মুরগি ডিম দিচ্ছে আরো ৩০ হাজার দুই সপ্তাহ পর থেকে ডিম দেওয়া শুরু করবে।
তিনি আরো বলেন, এ শিল্পকে ধরে রাখতে ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে তাদের এ উদ্যোগ। কিন্তু যেভাবে কাচামালের দাম বাড়ছে বেশিদিন হয়তো এ শিল্প টিকিয়ে রাখাই হবে কষ্ট কর।
তার দাবি চাহিদার তুলনা উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় কমেছে মুরগির বাচ্চার দাম। বর্তমানে প্রতিটি বাচ্চার উৎপাদন খরচ পড়ছে ২৭ টাকা আর বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা করে। তাই সরকারীভাবে মুরগির বাচ্চা দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
গোয়ালন্দ উপজেলায় লাগামহীন লোডশেডিং জনজীবনকে বিপর্যন্ত করে তুলেছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোলট্রি জোন হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মারাত্মক সংকটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে গোয়ালন্দে বিদ্যুতের সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। একের পর এক লোডশেডিংয়ের কারণে দিনের পাশাপাশি রাতেও জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ।
গত এক সপ্তাহে দিন এবং রাতের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। সকাল, বিকেল সন্ধ্যা, রাত ও গভীর রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ বন্ধ ও চালু হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে স্থানীয়রা।
তীব্র গরমে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পোলট্রি খাত। বিদ্যুৎ না থাকায় খামারগুলোতে বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমে অনেক মুরগি অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানান খামারিরা।
গোয়ালন্দ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুর রহমান বলেন, ‘নিয়মিত লোডশেডিং ও তীব্র গরমে পোলট্রি খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। জেনারেটর চালিয়ে খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠছে। অনেক খামার বন্ধ হওয়ার পথে।’ হাসপাতালে বাড়ছে দুর্ভোগ অন্যদিকে অধিকাংশ অটোরিকশাচালক অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দিতে পারেন না। এক বেলা গাড়ি চালালে আরেক বেলা বসে থাকতে হয়। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) গোয়ালন্দ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রকৌশলী তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘গোয়ালন্দে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৩ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, প্রাণিজ সম্পদ বৃদ্ধি করে চাহিদা মেটানো ও কর্মসংস্থান তৈরিতে গোয়ালন্দ উপজেলা রাখছে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা। খামার ও হ্যাচারিচের বায়োসিকিউরিটি বজায় রাখতে সব সময় নজরদারি করা হচ্ছে। এতে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এছাড়াও ডিম, মাংস ও মুরগীর বাচ্চা উৎপাৎদনের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখছে এই জেলার খামারীরা। বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে।