বান্দরবানের লামার ইয়াংছার রাহিম হোসেন ধনুক হাতে ছুটছেন আন্তর্জাতিক সাফল্যের পথে, জাতীয় আর্চারি দলে জায়গা করে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করাই স্বপ্ন

সাদ্দাম হোসেন সাইফ, লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি:

পাহাড়ঘেরা বান্দরবানের প্রত্যন্ত জনপদ লামা উপজেলার ইয়াংছা থেকে উঠে এসে ধনুক হাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন তরুণ আর্চার রাহিম হোসেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর অনুশীলন, একাগ্রতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।
এখন তাঁর চোখ জাতীয় আর্চারি দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার দিকে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহিমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ মাঠে সকাল কিংবা বিকেলে নিয়মিত ধনুক হাতে অনুশীলন করতে দেখা যায়। পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও খেলাটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তাঁকে নিয়মিত অনুশীলনে ধরে রেখেছে।

স্কুলজীবনেই আর্চারির প্রতি ভালোবাসা

লামা কোয়ান্টাম কসমো স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনার সময় ধনুক ও তীরের এই খেলাটির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তীতে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের লামা শাখার ইনচার্জ সালেহ আহমেদের অনুপ্রেরণায় ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর পেশাদারভাবে আর্চারির জগতে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রাহিমকে। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ আর্চারি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার আর্চারি ক্লাবের সদস্য হিসেবে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করছেন।

জাতীয় পর্যায়ে একাধিক পদক
কঠোর পরিশ্রম ও ধারাবাহিক অনুশীলনের ফলও পেয়েছেন রাহিম। জাতীয় আর্চারি প্রতিযোগিতায় ইতোমধ্যে দুটি রৌপ্য পদক অর্জন করেছেন তিনি। এছাড়া বাংলাদেশ আর্চারি লিগে একটি স্বর্ণ ও দুটি রৌপ্য পদকসহ বিভিন্ন জাতীয় ও অন্যান্য প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পদক জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর।

তবে পদক জয়ের চেয়েও বড় লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চান এই তরুণ। তাঁর স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনা।

প্রতিদিন চার ঘণ্টা অনুশীলন
রাহিমের মতে, আর্চারিতে ভালো করতে হলে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন মনোযোগ, ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা ও শারীরিক ফিটনেস। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি অনুশীলনকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে চলছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে সপ্তাহে ছয় দিন সকাল ও বিকেল মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় চার ঘণ্টা অনুশীলন করেন রাহিম। যবিপ্রবিতে আর্চারি অনুশীলনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে আবেদন করার পর তিনি নিয়মিত অনুশীলনের অনুমতিও পেয়েছেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্চারি অনুশীলনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি। সীমিত সুযোগের মধ্যেই নিজের লক্ষ্য পূরণে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।

ব্যয়বহুল খেলায় পরিবারের সহযোগিতাই বড় শক্তি
আর্চারি যে ব্যয়বহুল একটি খেলা, সেটিও জানিয়েছেন রাহিম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতামূলক মানের একটি ভালো ধনুকের দাম পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। সরঞ্জাম, অনুশীলন ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এই খেলায় টিকে থাকা অনেকের জন্যই কঠিন।

এই কঠিন পথচলায় পরিবারের সহযোগিতাকে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখেন রাহিম। বিশেষ করে তাঁর মায়ের অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

রাহিম হোসেন বলেন, “আর্চারি ব্যয়বহুল একটি খেলা। প্রতিযোগিতামূলক ভালো মানের একটি ধনুকের দাম পাঁচ লাখ টাকারও বেশি। এমন ব্যয়বহুল খেলায় টিকে থাকার পথে পরিবারের সাপোর্ট আমার জন্য বিশেষ নিয়ামত। বিশেষ করে আজ আমি যতটুকু পথ এগিয়েছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মায়ের। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা ছাড়া এই জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হতো না।”
স্বপ্ন জাতীয় দলের জার্সি, লক্ষ্য দেশের জন্য কিছু করা
নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে রাহিম বলেন, “আমি একজন আর্চার হিসেবে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। দেশের জন্য ভালো কিছু করাই আমার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।”

রাহিমের এই স্বপ্ন শুধু একজন তরুণ ক্রীড়াবিদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন নয়; এটি পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদের অসংখ্য সম্ভাবনাময় তরুণের জন্যও অনুপ্রেরণার গল্প। প্রয়োজনীয় সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারেন—রাহিম হোসেন তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
লামার ইয়াংছা থেকে ধনুক হাতে শুরু হওয়া রাহিমের এই যাত্রা এখন জাতীয় দলের স্বপ্ন ছুঁয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পথে।

তাঁর এই স্বপ্নপূরণের যাত্রায় প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা। সঠিক সুযোগ ও সমর্থন পেলে একদিন বাংলাদেশের পতাকা আন্তর্জাতিক আর্চারি মঞ্চে উড়ানোর স্বপ্ন পূরণ করবেন—এমন প্রত্যাশাই তাঁর পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top