রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের পর লালমনিরহাটেও চা চাষের এক অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ২১ বছরের কঠোর পরিশ্রম আর তিল তিল সাধনায় গড়ে ওঠা ২৫ একরের বিস্তীর্ণ চা বাগানটি এখন চরম ব্যাংকিং জটিলতা ও চক্রান্তের মুখে মুখ থুবরে পরেছে।
এই প্রেক্ষাপটে লালমনিরহাটের ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা ও চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বৈষম্যের শিকার উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং ৫০০ থেকে ১,০০০ পরিবারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘোষণা এসেছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) লালমনিরহাটের সোমা চা বাগান সরজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে আয়োজিত এক সুধী ও জনসভায় এসব কথা বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু (এম,পি)।
২১ বছরের সাধনা ও ৫০০ পরিবারের অনিশ্চয়তা প্রতিকূল পরিবেশ ও নানা বাধা ডিঙিয়ে স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তা ফেরদৌস ও তাঁর স্ত্রী সোমা আড়াই শ থেকে ৫০০ পরিবারের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে এই চা বাগান ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলেন। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বাগানটি পূর্ণাঙ্গ সচল থাকলে ১ হাজার বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। তবে জমি বন্ধক ও ঋণ মঞ্জুরের নামে ব্ল্যাঙ্ক চেক নেওয়া এবং নানা আইনি জটিলতা তৈরি করে একটি চক্র কারখানাটি বন্ধের চক্রান্ত করছে।
উদ্যোক্তারা জানান, প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি চা দিয়ে প্রাকৃতিক রং ও বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহার সম্ভব, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরিদর্শনের সময় স্থানীয় বাসিন্দারা চায়ের ভেষজ গুণাগুণ উল্লেখ করে হাস্যরসের সঙ্গে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, কাঁচা চা পাতা চিবিয়ে খেলে রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা মেলে।
সরকারের বৈষম্য দূর ও শিল্প সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য কালে ত্রাণ মন্ত্রী বলেন, “লালমনিরহাট দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। কৃষির বাইরে এখানে বড় কর্মসংস্থান ছিল না। নিজের ভিটেবাড়িতে গরম ভাত খেয়ে কাজ করার যে সুযোগ উদ্যোক্তা ফেরদৌস-সোমা দম্পতি তৈরি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে ও বেকারত্ব দূর করতে উত্তরাঞ্চলে এমন উদ্যোগ রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি বিগত সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, “সহযোগিতার বদলে ফাইল আটকে রাখা ও ফিতা কাটার রাজনীতিতে উদ্যোক্তাদের রক্তঝরা কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সময়মতো পাশে না দাঁড়ালে হয়তো এই সম্ভাবনাময় খাতকে ‘রেড জোন’ বানিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হতো।”
মন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সরকারের বাজেটে অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের জন্য ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং ডিউটি ফ্রি সুবিধাসহ বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
চা শ্রমিকদের ভাতা নিয়মিতকরণ
আইনি ও ব্যাংকিং জটিলতা নিরসনে মন্ত্রী উদ্যোক্তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ঢাকায় আসার পরামর্শ দেন। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে কারখানাটি সচল করার দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চা শ্রমিকদের দেওয়া নিয়মিত ভাতা যে সাময়িক অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, তা দ্রুত দূর করে ভাতা নিয়মিতকরণের আশ্বাসও দেওয়া হয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, চা বাগানের মালিক ও সাধারণ শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন। বাগান পরিদর্শন ও জনসভা শেষে মন্ত্রী হাতীবান্ধা ও পাটগ্রামের অন্যান্য নির্ধারিত কর্মসূচির উদ্দেশে রওনা হন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পেলে লালমনিরহাটের এই ২৫ একরের সবুজ চা বাগান উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।