পেঁয়াজ পচনরোধে ‘এয়ার ফ্লো’ মেশিন, কৃষিতে নীরব বিপ্লব রাজবাড়ীর শাহিনের

মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:

পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের অন্যতম প্রধান জেলা রাজবাড়ী। দেশের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেঁয়াজের জোগান আসে এ জেলা থেকে। প্রতিবছর সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। এতে ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। সেই ক্ষতি কমিয়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা শাহিন মন্ডল। নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন পেঁয়াজ সংরক্ষণের আধুনিক ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’। তার তৈরি এ প্রযুক্তি ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
পাংশা সরদার বাসস্ট্যান্ড থেকে কিছুটা এগিয়ে মৈশালা বাজার। সেখানেই ছোট্ট প্রতিষ্ঠান ‘শাহীন মেশিনারিজ’। অটোমোবাইলস ব্যবসা দিয়ে পথচলা শুরু হলেও কৃষকের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরির স্বপ্ন থেকেই ধীরে ধীরে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবনে যুক্ত হন শাহিন মন্ডল।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কোনো শিক্ষা না থাকলেও নিজের আগ্রহ, শ্রম ও কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক কৃষিযন্ত্র তৈরি করতে থাকেন তিনি। শুরুতে কয়েকটি যন্ত্র তৈরির পর সফলতা পেয়ে উৎসাহিত হন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান থেকে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য প্রায় ২৫ ধরনের যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’। অল্প জায়গায় অধিক পরিমাণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ এবং বাতাস চলাচলের মাধ্যমে পেঁয়াজের পচন কমাতে সহায়তা করে এ মেশিন। ফলে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কৃষকদের জন্য।

সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ঃ
সনাতন পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে গিয়ে প্রতিবছরই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন কৃষকরা। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না করা, আর্দ্রতা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে পেঁয়াজে পচন দেখা দেয়। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন। আবার সংরক্ষণ করতে না পেরে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

শাহিন মন্ডলের তৈরি এয়ার ফ্লো মেশিন সেই বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তার দাবি, মেশিনটি ব্যবহার করে অল্প জায়গায় অধিক পরিমাণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে পেঁয়াজের পচন কমিয়ে কৃষকের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

ইতোমধ্যে তার তৈরি এয়ার ফ্লো মেশিনের সুনাম রাজবাড়ীর গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় মেশিনটির বিক্রিও বেড়েছে।
রাজবাড়ী কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জেলায় সরকারিভাবে ১ হাজার ৬০০টি পেঁয়াজ সংরক্ষণ বা এয়ার ফ্লো মেশিন কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর রাজবাড়ী জেলায় আরও ৪ হাজার ৫২০টি এয়ার ফ্লো মেশিন কৃষকদের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া দেশের ২৯টি জেলায় কৃষকদের মধ্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের সরকারি উদ্যোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে দেশব্যাপী এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারিভাবে বিতরণ করা এয়ার ফ্লো মেশিনের মান ও ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ভালো মানের মেশিন কৃষকদের কাছে পৌঁছালে পেঁয়াজের পচন রোধে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

উদ্যোক্তার নানা সংকট ঃ
তবে সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগের উদ্যোক্তা শাহিন মন্ডল নিজেই নানা সমস্যার মধ্যে রয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিসহ নানা কারণে বর্তমানে তার ব্যবসা অনেকটা চাপের মধ্যে রয়েছে।
শাহিন মন্ডল বলেন, ‘কৃষকের উপকার হবে এবং দেশের টাকা দেশে থাকবে—এই চিন্তা থেকেই কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ শুরু করি। বর্তমানে প্রায় ২৫ ধরনের কৃষি যন্ত্র তৈরি করছি। এর মধ্যে এয়ার ফ্লো মেশিন কৃষকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে। প্রযুক্তিগতভাবে আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী মেশিন তৈরির চেষ্টা করছি। তবে অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা সমস্যায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে সরকারের সহযোগিতা চাই।’

তিনি আশা প্রকাশ করেন, তার তৈরি এয়ার ফ্লো মেশিন বৃহৎ পরিসরে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হলে একদিকে পেঁয়াজের পচন কমবে, অন্যদিকে কৃষকের লোকসান কমিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শাহিন মন্ডল একজন কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির উদ্যোক্তা। পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের মধ্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ প্রযুক্তি পেঁয়াজের পচনরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর বিতরণ করা এয়ার ফ্লো মেশিন নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে বড় ধরনের কোনো ত্রুটির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কৃষকরা মেশিন ব্যবহার করে পেঁয়াজ সংরক্ষণে উপকৃত হয়েছেন।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পেঁয়াজ উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষকের লোকসান কমবে, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং সংরক্ষণ-পরবর্তী অপচয় অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। রাজবাড়ীর তরুণ উদ্যোক্তা শাহিন মন্ডলের উদ্ভাবনী উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকেই আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top