মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় অসাধু সার ডিলারদের কারসাজিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার বিক্রি, চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ না করা এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে। আমন মৌসুমে সারের এমন সংকটে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার কৃষকরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিলারদের সার উত্তোলন, মজুত ও বিতরণ কার্যক্রম যথাযথভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে না। ফলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সার বিতরণ ও বিক্রিতে অনিয়ম চলছে। কৃষকদের দাবি, প্রতিটি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ডিলারদের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে গোয়ালন্দ উপজেলায় প্রায় ২৪ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদ করা হয়েছে। কৃষকদের মাঝে সরকারি মূল্যে রাসায়নিক সার সরবরাহের জন্য উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির মোট পাঁচজন ডিলার রয়েছেন। তাদের অধীনে ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছেন ৪৫ জন খুচরা ডিলার।
সার বিপণন নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ের ডিলাররা ইউনিয়ন পর্যায়ের খুচরা ডিলারদের কাছে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ করার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পাঁচজন ডিলারের কেউ কেউ খুচরা ডিলারদের কাছে নির্ধারিত দামে নিয়মিত সার সরবরাহ করেন না। অনেক সময় ‘সার নেই’সহ নানা অজুহাতে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। আবার বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
খুচরা ডিলারদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা না দিলে অনেক সময় সার পাওয়া যায় না। এমনকি ‘সার নেই’ বলে সরবরাহ না করে বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারিত মূল্যের এমওপি সার বস্তাপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স হোসেন আলী বেপারি, মেসার্স স্বপন কুমার সাহাসহ কয়েকজন ডিলার তাদের অধীনস্থ খুচরা ডিলারদের বাইরে সার বিক্রি করছেন। দৌলতদিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা মেসার্স খন্দকার ফারুক হোসেন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধেও খুচরা ডিলারদের কাছে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
মেসার্স হোসেন আলী বেপারির অধীনে থাকা নয়জন খুচরা ডিলারের মধ্যে কয়েকজন নিয়মিত সার পেলেও অনেকেই নিয়মিত সার পান না বলে অভিযোগ করেছেন। পাশাপাশি মোমিন খার হাটসহ আশপাশের এলাকায় সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে ওই ডিলারের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, ছোট্ট ভাকলা ইউনিয়নের মেসার্স সপ্তবর্না ট্রেডার্সের অধীনে থাকা প্রায় ২৭ জন খুচরা ডিলারের কাছেও পর্যাপ্ত সার সরবরাহ করা হয় না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পৌর এলাকার ডিলার স্বপন কুমার সাহার বিরুদ্ধেও উপজেলার বাইরে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পাওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপির সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে টিএসপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত, ডিএপি প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং এমওপি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি নেওয়া হচ্ছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়নের আইনদ্দিন প্রামাণিকের পাড়ার কৃষক আক্তার হোসেন বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না। দোকানে গেলে ডিলাররা বলেন সার নেই। বাধ্য হয়ে বেশি দামের খুচরা দোকান থেকে সার কিনতে হচ্ছে।’
উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবগ্রাম, উজানচর ও ছোট্ট ভাকলা ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠে আমন আবাদ নিয়ে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কোথাও জমি তৈরির কাজ চলছে, কোথাও আগাম জাতের আমন ধান রোপণ করা হচ্ছে। আগস্টের শেষ নাগাদ এ কর্মযজ্ঞ চলবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
কৃষকরা বলছেন, আমনের ভালো ফলনের জন্য সময়মতো সার প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু সরকারি মূল্যে সার না পাওয়ায় সামর্থ্যবান কৃষকরা বেশি দামে সার কিনতে পারলেও মাঝারি ও প্রান্তিক কৃষকরা এক-দুই বস্তা সার কিনতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
খুচরা ডিলারদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলা পর্যায়ের ডিলারদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত সার পাওয়া গেলে তারাও নির্ধারিত দামেই কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হয়। ফলে কৃষকদের কাছ থেকেও বেশি দাম নিতে হচ্ছে।
তাদের আরও অভিযোগ, বড় ডিলাররা খুচরা ডিলারদের কাছে টাকা বাকি রাখতে চান না। অথচ খুচরা ব্যবসায়ীদের কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করে টাকা ফেরত পেতে সময় লাগে। এর পাশাপাশি কিছু ডিলার সরাসরি খুচরা দোকানের বাইরে সার বিক্রি করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেসার্স হোসেন আলী বেপারি ট্রেডার্সের সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, তারা যেভাবে সার পান, সেভাবেই বিক্রি করেন এবং সব খুচরা ডিলারকেই সার দেওয়ার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের কারণে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা নিচ্ছে। তাদের দাবি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার-বীজ মনিটরিং কমিটির নিয়মিত বৈঠকে সারের সংকট নেই বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, ‘ডিলারদের বিষয়ে নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় এবং সার নির্ধারিত দামে বিক্রির বিষয়ে বলা হয়। কেউ বেশি দামে সার বিক্রি করলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুল হুদা বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সারের দাম বেশি রাখার কোনো সুযোগ নেই। নিয়মিত বাজার ব্যবস্থাপনা মনিটরিং করা হবে।’
কৃষকদের দাবি, আমন মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম বন্ধে দ্রুত মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা, ডিলারদের সার উত্তোলন ও বিতরণ কার্যক্রমের স্বচ্ছ হিসাব যাচাই এবং সরকারি মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রি নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।