শতবর্ষেও আধুনিক মর্গ পায়নি পাবনা, পরিত্যক্ত গ্যারেজেই ময়নাতদন্ত

নিজস্ব প্রতিনিধি:

প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জেলা পাবনায় এখনো গড়ে ওঠেনি একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক মর্গ। ফলে অস্বাভাবিক মৃত্যু, হত্যা কিংবা দুর্ঘটনায় নিহতদের মরদেহ নিয়ে স্বজনদের পড়তে হচ্ছে চরম দুর্ভোগে। পাবনা জেনারেল হাসপাতালের পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল গ্যারেজের সংকীর্ণ কক্ষেই চলছে ময়নাতদন্তের কাজ। হিমঘর না থাকায় মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত।

হাসপাতালের বর্তমান মর্গে একসঙ্গে একটির বেশি মরদেহের ময়নাতদন্ত করা সম্ভব নয়। ফলে একাধিক মরদেহ এলে বাকিগুলো মেঝেতে রাখতে হয়। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের। এতে একদিকে যেমন মরদেহের স্বাভাবিক সংরক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ভোগান্তি।

তবে এই সংকট সমাধানে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর আইনি জটিলতায় তা থেমে যায়। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় তৈরি ভবনটিও এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এর বিভিন্ন স্থানে ফাটলও দেখা দিয়েছে।

হাসপাতাল ও গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক মর্গ ও হিমঘর নির্মাণ শুরু হয়। ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ এগিয়ে একপর্যায়ে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়।

কিন্তু ভবনটির অবস্থান নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন আপত্তি জানান। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ালে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উচ্চ আদালত দুই মাসের জন্য নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ দেন। পরে সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প আর সচল হয়নি। আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ও পেরিয়ে গেছে।

ফলে যে অবকাঠামোটি চালু হলে জেলার দীর্ঘদিনের মর্গ সংকটের অবসান হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।

ময়নাতদন্তের বর্তমান ব্যবস্থার চিত্র আরও করুণ। হাসপাতালের পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল রাখার জায়গাকে মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে জায়গা ও প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামের সংকট রয়েছে। একটির ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য মরদেহগুলোকে অপেক্ষা করতে হয়।

গত জুনে ছুরিকাঘাতে নিহত কলেজছাত্র মনিরুলের স্বজন রফিকুল ইসলাম সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, হত্যার পরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য। একই সময়ে একাধিক মরদেহ থাকায় সিরিয়াল অনুযায়ী একটির পর একটি ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। স্বজনদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর অভিজ্ঞতা।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আধুনিক সুবিধা না থাকায় মরদেহ সংরক্ষণে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। আধুনিক মর্গ চালু হলে মরদেহ সংরক্ষণের পাশাপাশি ভিসেরা ও বিভিন্ন রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংগৃহীত আলামত নিরাপদে রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

তার মতে, আধুনিক ময়নাতদন্তকেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত পরিবেশ থাকে। এতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ফরেনসিক চিকিৎসকদের কাজ আরও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

মর্গ সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিচয়হীন মরদেহের ক্ষেত্রেও। কোনো মরদেহ শনাক্তের জন্য কয়েক দিন সংরক্ষণ করা প্রয়োজন হলেও পাবনায় সেই ধরনের পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেই। একইভাবে বিদেশে থাকা স্বজনদের দেশে ফিরে মরদেহ গ্রহণের আগ পর্যন্ত সংরক্ষণের সুযোগও সীমিত।

পুলিশ প্রশাসনও এ সংকটে সমস্যায় পড়ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পাবনায় প্রতি মাসে গড়ে চারটি হত্যা এবং প্রায় ৩৫টি অপমৃত্যুর মামলা হয়। ফলে নিয়মিতই ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে মরদেহ আনা হয়।

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশরাফ বলেন, প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই জেলায় বিভিন্ন ঘটনায় নিয়মিত মরদেহ আসে। কিন্তু হাসপাতালের নিজস্ব হিমঘর না থাকায় সেগুলো সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পুলিশের উদ্যোগে জেলার ১১টি থানার মধ্যে পাঁচটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মরদেহ সংরক্ষণ কক্ষ তৈরি করা হলেও প্রতিটিতে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি মরদেহ রাখা সম্ভব।

আধুনিক মর্গ প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু কিংবা নতুন করে দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দীর্ঘদিনের এই সংকটের অবসানে এখন প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ আধুনিক মর্গ শুধু মরদেহ সংরক্ষণের অবকাঠামো নয়, বরং সঠিক ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক প্রমাণ নিশ্চিত করারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাবনার মতো বৃহৎ জনসংখ্যার জেলায় সেই মৌলিক সুবিধা আর কতদিন অনুপস্থিত থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top