রবিউল ইসলাম বাবুল, রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায় চায়ের উর্বর ভূমি এক অসহায় বিধবা নারীর জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন চা-বাগানটি দখলের লক্ষ্যে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী নারী, শালবাহান ইউনিয়নের কুমারটোল গ্রামের বাসিন্দা জমিলা খাতুন (৩৫), গত শনিবার তেঁতুলিয়া মডেল থানায় তিন আত্মীয় এবং কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে জামিলার স্বামী কালাম হোসেন পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার স্ত্রী ও চার কন্যাসন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে মৌখিকভাবে ৩০ শতক জমিতে চা চাষের অনুমতি দিয়ে যান। স্বামীর আকস্মিক প্রয়াণের পর, এই চা-বাগানটির পরিচর্যা এবং কাঁচা চা-পাতা বিক্রয় করেই জমিলা তার চার মেয়ের মুখে অন্ন তুলে দিয়ে আসছেন।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে পঞ্চগড়ে কাঁচা চা-পাতার বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায়, লোভের বশবর্তী হয়ে তার ভাসুর আলম (৪৫) ও মোস্তফা (৬০) এবং শাশুড়ি ফিরোজা বেগম ওই চা-বাগানটিকে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করতে শুরু করেন। তারা বাগানটি জবরদখল করার জন্য নানাভাবে জমিলাকে হয়রানি করে আসছিলেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে এই দখলচেষ্টাকে কেন্দ্র করে আলম ও মোস্তফা চরম মারমুখী আচরণ শুরু করেন। তারা জামিলার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হন এবং একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।

অভিযোগে জমিলা উল্লেখ করেন, আলম তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মেরেছিলেন। জামিলার আর্তচিৎকার শুনে মোস্তফা এগিয়ে এসে তাকে আরও নির্যাতন করেন, তার চুল ধরে টানাটানি করে মাটিতে ফেলে দেন এবং তার পরিধেয় বস্ত্র টেনে ছিঁড়ে ফেলার মাধ্যমে চরম শ্লীলতাহানি করেন। পরবর্তীতে ফিরোজা বেগমসহ অন্যরা তাকে বাগান ও বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার অপচেষ্টা চালান বলে অভিযোগে জানা গেছে।
আহত জমিলাকে স্থানীয় প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণের পর সুস্থ হয়ে, তিনি শনিবার তেঁতুলিয়া মডেল থানায় গিয়ে ঘটনার বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
এবিষয়ে আলম মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাদের কে পাওয়া যাযনি।
এদিকে বুকভরা কান্না ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জমিলা খাতুন বলেন, “আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অনেক কষ্টে এই চা-বাগান দিয়েই মেয়েগুলোকে বড় করছি। এখন চা-পাতার দাম বাড়ায় ভাসুররা লোভ সামলাতে পারছে না। তারা আমাকে এবং আমার সন্তানদের পথে বসানোর পরিকল্পনা করছে। ঘটনার দিন তারা আমাকে মারধর করেছে, আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করেছে। আমি এই পাশবিকতার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই এবং আমার রুটি-রুজির একমাত্র পথ এই চা-বাগানটি রক্ষায় প্রশাসনের কাছ থেকে কঠোর নিরাপত্তা দাবি করছি।”
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শালবাহান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “স্বামীহারা একজন অসহায় মহিলার জীবন ধারণের পথ চা-বাগানটি। তার ওপর যদি জবরদখল ও নির্যাতনের এই ঘটনা সত্যি হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগীকে ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করার পরামর্শ দেব। আমরা স্থানীয়ভাবে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লাইছুর রহমান জানিয়েছেন, “এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র আমরা পেয়েছি। জমি-সংক্রান্ত বিরোধ হওয়ায় এর আইনি মীমাংসা আদালতের মাধ্যমে হতে হবে। তবে, আমরা অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি এবং প্রয়োজনীয় সব আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”