ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহে গত ১১ মাসে ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ জনতার হাতে গণপিটুনির অন্তত ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন এবং শিক্ষকসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। চুরি, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন হয়রানি ও পরকীয়ার অভিযোগের মতো বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এ ধরনের সহিংসতার ধারাবাহিকতায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশীল সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করে কাউকে গণপিটুনি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থি। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
থানা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ২১ আগস্ট পর্যন্ত ঝিনাইদহে অন্তত ছয়টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় তিনটি এবং কালীগঞ্জে তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনায় আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
হাসপাতাল ও আবাসন প্রকল্পে দুই মৃত্যু
২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে চুরির অভিযোগে সুজন মিয়া (২৮) নামে এক ব্যক্তিকে মারধর করেন স্থানীয় কয়েকজন। পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বাবা সদর থানায় অজ্ঞাত চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ ওই মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এরপর চলতি বছরের ৪ জুন সদর উপজেলার ক্যাডেট কলেজের সামনে ঝিনুকমালা আবাসন প্রকল্পে এক শিশুকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করার অভিযোগে বিল্লাল হোসেন (৪০) নামে এক রিকশাচালককে গণপিটুনি দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষের পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি মামলা করা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
গরু চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা
সবশেষ ২২ আগস্ট ভোরে কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামে গরু চুরির অভিযোগে যশোর ও নাটোরের দুই ব্যক্তিকে গাছে বেঁধে মারধর করেন স্থানীয়রা। এতে আয়নাল নামে একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। সুমন হোসেন নামে অপর ব্যক্তি আহত হন।
ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্য মামলায় আহত সুমনের ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন দুই থেকে তিনশ জনকে আসামি করেছেন। তবে কোনো মামলাতেই এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
সুমনের ভাই জাহাঙ্গীরের দাবি, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই একজন মানুষকে এভাবে মারধর করার অধিকার কারও নেই।
শিশুকে বেঁধে মারধর, শিক্ষকও রেহাই পাননি
গত ১১ জুলাই সদর উপজেলার ডাকবাংলা বাজারে মোবাইল চুরির অভিযোগে ১৪ বছরের এক শিশুর হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এর কয়েক দিন আগে সদর উপজেলার লৌহজং এলাকায় পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক বৃদ্ধ ও এক বৃদ্ধাকে বেঁধে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া ১৮ আগস্ট সকালে কালীগঞ্জ উপজেলার বড়-বায়শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে স্কুলের অফিসকক্ষে ঢুকে কয়েকজন মারধর করেন। এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। গুরুতর আহত শিক্ষককে ওই রাতেই একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
তবে শিক্ষকের পরিবারের দাবি, স্কুলের পুকুর ইজারার অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি মানববন্ধনও করেছে।
‘মব’ ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপের দাবি
মানবাধিকারকর্মী শরিফা খাতুন বলেন, কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। গণপিটুনি কোনোভাবেই অপরাধ দমনের বৈধ পদ্ধতি নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী একরামুল হক আলম বলেন, ‘মব’ বা গণপিটুনি আইনসম্মত নয়। কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পুলিশ প্রয়োজন মনে করলে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকেও স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করতে পারে। গণপিটুনির সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
পুলিশের বক্তব্য
ঝিনাইদহ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজ হোসেন জানান, যেসব মামলা পুলিশের হাতে রয়েছে, সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গণপিটুনির ঘটনায় একসঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত থাকায় যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা সমীচীন নয়। এ কারণে কিছু মামলায় সময় লাগছে।
জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, কোনো ব্যক্তির আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। গণপিটুনির মতো ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।