মোঃ আমিরুল হক, রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগ নির্ণয়ের নামে অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, ভুল রিপোর্ট দেওয়া এবং সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পাশাপাশি একের পর এক পরীক্ষা করানোর কারণে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনার চেয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসকের ফি, বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ মিলিয়ে অসুস্থ মানুষের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি আর্থিক চাপ। একই সঙ্গে ভুল বা অসংগতিপূর্ণ রিপোর্টের কারণে রোগীরা ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিতেও পড়ছেন। এর একটি উদাহরণ লাকী আক্তার। পেটে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি গোয়ালন্দের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান। পরীক্ষার পর দেওয়া প্রতিবেদনে তার কিডনিতে পানি জমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। ওই রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসক তাকে ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন।
কয়েকদিন ওষুধ সেবনের পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিনি ফরিদপুরের জায়েদ মেমোরিয়াল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে পুনরায় আল্ট্রাসনোগ্রাফি করান। সেখানে দেওয়া প্রতিবেদনে তার গলব্লাডারে (পিত্তথলিতে) পাথর থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। পরে পুনরায় পরীক্ষা করিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হন বলে দাবি করেন লাকী আক্তার।
তার অভিযোগ, গোয়ালন্দে করা প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্ট সঠিক ছিল না। ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ সেবন করায় তিনি একদিকে যেমন শারীরিকভাবে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, অন্যদিকে সময় ও অর্থও নষ্ট হয়েছে।
স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, সরকারি হাসপাতালে ৮০ টাকার ইসিজি পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে ২০০ টাকার সিবিসি (CBC) পরীক্ষার জন্য কোথাও কোথাও ৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। একইভাবে সরকারি হাসপাতালে ডায়াবেটিস পরীক্ষা ৬০ টাকায় করা হলেও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ পরীক্ষার জন্য প্রায় ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রোগীদের আরও অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত বা পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে রোগীদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
মজলিসপুর চর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আলেয়া বেগম বলেন, “হাসপাতালে ডাক্তার দেখাইছিলাম। ডাক্তার নাকি টেস্ট দিছে। পরে তারা বলল, হাসপাতালের টেস্ট নাকি ভালো না, বাইরে থেকে করাতে হবে। তাই বাইরে গিয়ে টেস্ট করাতে হইছে।”
আরেক রোগীর স্বজন বলেন, চিকিৎসকের ফি দেওয়ার পর একাধিক পরীক্ষা করানোর খরচ যোগ হলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার মতো অর্থও হাতে থাকে না। দরিদ্র মানুষের জন্য এভাবে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, “ক্লিনিক চলে টেস্টের টাকায়। টেস্ট না দিলে মালিকপক্ষ আমাদের চাপ দিতে থাকে। ইনিয়ে-বিনিয়ে নানা কথা বলে আমরা টেস্ট দিতে বাধ্য হই।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সঙ্গে অতিরিক্ত পরীক্ষাও যুক্ত করা হয়। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় প্যাথলজিস্ট, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগ নির্ণয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চরাঞ্চল ও নিম্নআয়ের মানুষ বেশি বিপাকে
গোয়ালন্দ উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এর মধ্যে নদীভাঙনকবলিত ও চরাঞ্চলের মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, দিনমজুরি ও ছোট ব্যবসাসহ বিভিন্ন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত। ফলে চিকিৎসার পেছনে বাড়তি ব্যয় তাদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
উপজেলার সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রধান ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের তুলনায় সরকারি হাসপাতালে সেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। অভিযোগ উঠেছে, মানুষের এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়েই কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে চলছে ‘টেস্ট বাণিজ্য’।
স্থানীয়দের প্রশ্ন রোগীর প্রয়োজনীয়তা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মের পরিবর্তে যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষ সঠিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা পাবে কীভাবে?
গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ মারুফ হাসান বলেন, “চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাই রোগীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে কোনোভাবেই চিকিৎসাকে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝায় পরিণত করা উচিত নয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালেই বেশির ভাগ পরীক্ষা করা সম্ভব। হাসপাতালের পরীক্ষার মানও বাইরের তুলনায় ভালো।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গোয়ালন্দের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে নিয়মিত তদারকি, পরীক্ষার মূল্যতালিকা প্রকাশ, প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা এবং ভুল রিপোর্টের অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও কার্যকর নজরদারি চান তারা।
সচেতন মহলের মতে, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই রোগীর অসুস্থতা ও অসহায়ত্বকে কোনোভাবেই ব্যবসার হাতিয়ার বানানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিলে একদিকে যেমন রোগীদের অতিরিক্ত ব্যয় কমবে, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবার প্রতি মানুষের আস্থাও ফিরবে।