জেকেএমের চেয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ

জেকেএমের চেয়ে বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রচলিত মূল্যসূচকের তুলনায় বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গত সপ্তাহে স্পট মার্কেটের দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি এলএনজি কার্গো কিনতে পেট্রোবাংলার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, জাপান কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) মূল্যসূচকের তুলনায় এসব কার্গোর জন্য অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বেশি গুনতে হয়েছে।

অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরামকোর কাছ থেকে জেকেএম সূচকের চেয়ে কিছুটা কম দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে পেরেছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ চুক্তিভিত্তিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে সুবিধা মিললেও স্পট মার্কেটে দরপত্র আহ্বান করলে তুলনামূলকভাবে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) গত সপ্তাহে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর, ১-২ অক্টোবর এবং ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য তিনটি এলএনজি কার্গোর দরপত্র আহ্বান করে। এসব দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের জেকেএম মূল্যসূচকের চেয়ে বেশি দামে এলএনজি কেনার প্রস্তাব পাওয়া যায়।

প্রথম কার্গোর ক্ষেত্রে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার দর প্রস্তাব করে। ওই সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ০৯ ডলার। ফলে শুধু এই কার্গোতেই প্রায় ৯০ লাখ ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয় কার্গোর জন্য ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল বিপি সিঙ্গাপুর। তাদের প্রস্তাবিত দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩ ডলার। ওই সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। ফলে এই কার্গোতেও প্রায় ৯০ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা জানা গেছে।

৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য তৃতীয় কার্গোর সর্বনিম্ন দর প্রস্তাব করে বিটল ইশয়া লিমিটেড। তাদের দর ছিল ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলার। বিপরীতে ওই সময় জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। ফলে এ ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক সূচকের তুলনায় বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে।

আরপিজিসিএলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তিনটি কার্গোর জন্য যখন স্পট মার্কেটে দরপত্র আহ্বান করা হয়, তখন প্ল্যাটস ও জেকেএমের মূল্য ছিল ২২ দশমিক ৮২ থেকে ২৪ দশমিক ৬১ ডলারের মধ্যে। সেই হিসাবেও দরপত্রের মাধ্যমে কেনা এলএনজির মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে।

কেন বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে

স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে আরপিজিসিএল ও পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে জ্বালানি বিভাগকে তথ্য দেওয়া হয়েছে।

সেখানে প্রথম কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের অস্থিরতার কথা বলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে ৯-১০ ডলারের মধ্যে থাকা এলএনজি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ২০ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বাংলাদেশের এলএনজি গ্রহণ ও জাতীয় গ্যাস গ্রিডে মেশানোর নির্দিষ্ট কারিগরি সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির গড় হিটিং ভ্যালু ১ হাজার ৯০ থেকে ১ হাজার ১১৮ বিটিইউ প্রতি স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুটের (এসসিএফ) মধ্যে থাকে। এতে মিথেনের পরিমাণও তুলনামূলক বেশি।

তবে আমদানি করা এলএনজিকে দেশের উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে মিশিয়ে সরবরাহ করতে হয়। এ কারণে পেট্রোবাংলাকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে গড় হিটিং ভ্যালু রাখার প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সরবরাহকারী বাংলাদেশে এলএনজি দিতে আগ্রহ দেখায় না।

তৃতীয়ত, স্পট মার্কেটের দরপত্রে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এলএনজি সরবরাহের শর্ত থাকার বিষয়টিও দাম বাড়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে কার্গো সরবরাহের বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক সম্ভাব্য সরবরাহকারী দরপত্রে অংশ নিতে পারে না।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহী হলেও স্বল্প সময়ের সরবরাহ শর্তের কারণে তারা দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না বলে জ্বালানি বিভাগকে দেওয়া ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অস্থিরতা, বাংলাদেশের কারিগরি শর্ত এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে কার্গো সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা—এই তিনটি বিষয় স্পট মার্কেটে এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে।

ফেসবুকে আমরা

মন্তব্য করুন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted

সর্বাাধিক পঠিত নিউজ

Scroll to Top