ইমতিয়াজ, জবি প্রতিনিধি:
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) এর ফিন্যান্স বিভাগে “জুলাই গণঅভ্যুত্থান: প্রেক্ষাপট, প্রভাব ও করণীয়” শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনের মূল কারণ, ফ্যাসিবাদের নির্মমতা এবং শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষায় বর্তমান করণীয় নিয়ে আলোকপাত করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ রইছ উদ্দিন বলেন, “বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে মানুষের মৌলিক বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। মানুষ যখন দেখেছে যে, আর বাঁচার উপায় নেই ঠিক তখনই সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিল। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়াতেই এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে।”
বক্তব্যের শুরুতে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রথমে মেধার স্বীকৃতি ও যোগ্য বিচার-বিবেচনার দাবিতে ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনে নেমেছিল। পরবর্তীতে তা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং পরিশেষে একদফার আন্দোলনে রূপ নেয়। এর পেছনের মূল কারণটি শুধু কোটা সংস্কার ছিল না, এটি ছিল বিগত দেড় দশক ধরে চরম নির্যাতনের শিকার অধিকারহারা মানুষের জমে থাকা করুণ আর্তনাদ।”
তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আল্লাহ মানুষকে কথা বলার যে জন্মগত অধিকার দিয়েছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সেই বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী খাদিজাতুল কুবরাকে ১৫ মাস বিনা অপরাধে জেল খাটতে হয়েছে। আমাদের ১৩ জন সাধারণ শিক্ষার্থী যারা মেসে থেকে কষ্ট করে পড়াশোনা করছিল তাদেরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এগুলো কোনো বানিয়ে বলা গল্প নয়, এটাই বাস্তবতা।”
ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে জবি উপাচার্য বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোট দেওয়া প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু ১৫-১৬ বছর ধরে মানুষকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। দিনে ভোট হওয়ার কথা থাকলেও রাতে বাক্সে ভোট ভর্তি করা হয়েছে। যারা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল তারাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে একটি দল ও নির্দিষ্ট আদর্শের দিকে পরিচালিত করেছে। আমি নিজেও ভোট দিতে গিয়ে লাঠির আঘাত ও বাঁশের পিটুনি খেয়ে ফিরে এসেছি।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষের অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক সাগর-রুনি নীতি-নির্ধারকদের মুখোশ উন্মোচনকারী একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছিলেন বলেই তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কার্টুনিস্টকে ছবিতে প্রতিবাদ করার কারণে কারারুদ্ধ হতে হয়েছে, বিখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ছবি তোলার অপরাধে গ্রেপ্তার করে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে।”
গণঅভ্যুত্থানের অর্জন ধরে রাখার তাগিদ দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দিন বলেন, “শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শেষপর্যায়ে এসে যে আত্মত্যাগ ও অবদান রেখেছে, জাতি হিসেবে সারা জীবন আমাদের তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে এবং এর জাতীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। জুলাইয়ে প্রায় ১৮০০ থেকে ২০০০ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। যে পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, কেবল তারাই এই ক্ষতির বেদনা বোঝে।”
উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আহ্বান জানান, “আমরা যদি এসি রুমে বসে শুধুমাত্র আলোচনা আর বক্তব্যের মধ্যেই জুলাইকে সীমাবদ্ধ রাখি তবে আমরা নিজেদের বিবেকের কাছে দায়ী থাকবো। শহীদরা যে অধিকার ও বৈষম্যহীন সমাজের উদ্দেশ্যে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তা বাস্তবে রূপদান করাই এখন আমাদের প্রধান করণীয়।”
আলোচনা সভায় ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ বায়েজিদ আলীর সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন ছাত্র হল ১-এর প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোঃ ওমর ফারুক। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ মঞ্জুর মোর্শেদ ভুইয়া।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মঞ্জুর মোর্শেদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে ৫৬ শতাংশ কোটার বৈষম্য দূর করার ওপর জোর দেন। সমাপনী বক্তব্যে সভাপতি অধ্যাপক ড. বায়েজিদ আলী খান প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের সুশাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।